কিয়ামতের দিন যাদের সাথে আল্লাহ কথা বলবেন না!
কিয়ামতের দিন যাদের সাথে আল্লাহ কথা বলবেন না!
কুরআন, সহীহ হাদীস, তাফসীর ও সালাফদের বক্তব্যের আলোকে একটি বিস্তৃত আলোচনা
মানবজীবনের শেষ পরিণতি হলো আখিরাত।
দুনিয়ার জীবন ক্ষণস্থায়ী, কিন্তু আখিরাতের জীবন চিরস্থায়ী। সেই আখিরাতের প্রথম ও সবচেয়ে ভয়াবহ ধাপ হলো কিয়ামতের দিন। সেই দিনে প্রত্যেক মানুষ আল্লাহর সামনে উপস্থিত হবে এবং তার সমস্ত কাজের হিসাব দিতে হবে।
একজন মুমিনের জন্য সেই দিনের সবচেয়ে বড় আশা হলো আল্লাহর রহমত পাওয়া।
কিন্তু কুরআন ও সহীহ হাদীসে এমন কিছু মানুষের কথা বলা হয়েছে যাদের সম্পর্কে আল্লাহ ঘোষণা করেছেন—
কিয়ামতের দিন তিনি তাদের সাথে কথা বলবেন না,
তাদের দিকে তাকাবেন না এবং
তাদের পবিত্রও করবেন না।
এই ঘোষণা একজন মুমিনের হৃদয়কে গভীরভাবে নাড়া দেয়।
# কারা সেই সব ব্যক্তি??
তারা হলেন::—
১) অহংকারী দরিদ্র: যে অভাবী হওয়া সত্ত্বেও অহংকার করে।
২) বৃদ্ধ ব্যভিচারী: যে বার্ধক্যে পৌঁছেও জেনার (ব্যভিচার) মতো পাপে লিপ্ত হয়।
৩) মিথ্যাবাদী শাসক: যে জনগণের সাথে মিথ্যা বলে এবং প্রতারণা করে।
৪) পণ্য বিক্রির জন্য মিথ্যা কসমকারী: যে মিথ্যা শপথ করে নিজের মাল বিক্রি করে।
৫) টাখনুর নিচে কাপড় পরিধানকারী: যে পুরুষ দম্ভভরে টাখনুর নিচে কাপড় ঝুলিয়ে পড়ে।
৬) উপকার করে খোঁটা দানকারী: যে কাউকে দান বা সাহায্য করার পর তা বলে বেড়ায় বা খোঁটা দেয়।
৭) পিতামাতার অবাধ্য সন্তান: যে মা-বাবার সাথে দুর্ব্যবহার করে বা তাদের অবাধ্য হয়।
৮) দাইয়ুস: যে নিজের পরিবারে অশ্লীলতা বা বেহায়াপনা দেখেও তা প্রশ্রয় দেয় (কোনো ব্যবস্থা নেয় না)।
৯) পুরুষের বেশধারী নারী: যে নারী পুরুষের পোশাক বা চালচলন অনুকরণ করে।
নিচে বিস্তারিত ভাবে আলোচনা করা হলো;
কুরআনের সতর্কবাণী
১. আল্লাহর অঙ্গীকার সামান্য মূল্যে বিক্রি করা।
আল্লাহ তাআলা বলেন:
إِنَّ الَّذِينَ يَشْتَرُونَ بِعَهْدِ اللَّهِ وَأَيْمَانِهِمْ ثَمَنًا قَلِيلًا أُولَٰئِكَ لَا خَلَاقَ لَهُمْ فِي الْآخِرَةِ وَلَا يُكَلِّمُهُمُ اللَّهُ وَلَا يَنظُرُ إِلَيْهِمْ يَوْمَ الْقِيَامَةِ وَلَا يُزَكِّيهِمْ وَلَهُمْ عَذَابٌ أَلِيمٌ
অর্থঃ
যারা আল্লাহর অঙ্গীকার ও নিজেদের শপথ সামান্য মূল্যে বিক্রি করে, পরকালে তাদের কোনো অংশ নেই। কিয়ামতের দিন আল্লাহ তাদের সাথে কথা বলবেন না, তাদের দিকে তাকাবেন না এবং তাদের পবিত্রও করবেন না।( সূরা আলে ইমরান -৭৭)
মহান মুফাসসির Ibn Kathir বলেন যে এই আয়াত তাদের জন্য সতর্কবাণী যারা মিথ্যা শপথ করে মানুষের সম্পদ দখল করে অথবা দুনিয়ার স্বার্থে আল্লাহর অঙ্গীকার ভঙ্গ করে।
২. দ্বীনের সত্য গোপন করা।
আল্লাহ তাআলা বলেন:
إِنَّ ٱلَّذِينَ يَكْتُمُونَ مَآ أَنزَلَ ٱللَّهُ مِنَ ٱلْكِتَٰبِ وَيَشْتَرُونَ بِهِۦ ثَمَنًا قَلِيلًا أُو۟لَٰٓئِكَ مَا يَأْكُلُونَ فِى بُطُونِهِمْ إِلَّا ٱلنَّارَ وَلَا يُكَلِّمُهُمُ ٱللَّهُ يَوْمَ ٱلْقِيَٰمَةِ وَلَا يُزَكِّيهِمْ وَلَهُمْ عَذَابٌ أَلِيمٌ
অর্থঃ
আল্লাহ তাঁর কিতাবে যে সমস্ত বিধান অবতীর্ণ করেছেন সেগুলো যারা গোপন করে এবং সামান্য পার্থিব স্বার্থের বেদীমূলে সেগুলো বিসর্জন দেয় তারা আসলে আগুন দিয়ে নিজেদের পেট ভর্তি করছে।কিয়ামতের দিন আল্লাহ তাদের সাথে কথাই বলবেন না, তাদের পত্রিতার ঘোষণাও দেবেন না এবং তাদের জন্য রয়েছে যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি। (সূরা আল-বাকারা ১৭৪)
আয়াতের ব্যাখ্যাঃ
ধর্মীয় কুসংস্কার ও আলেম সমাজের দায়বদ্ধতা
সাধারণ মানুষের মধ্যে প্রচলিত বিভ্রান্তিকর কুসংস্কার এবং নব-উদ্ভাবিত অর্থহীন বিধি-নিষেধের বিস্তারের পেছনে প্রধানত তিনটি কারণ কাজ করে:
১. অর্জিত জ্ঞানের প্রচার না করা
যাদের কাছে আল্লাহর কিতাবের সঠিক জ্ঞান ছিল, তারা তা সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছানোর আমানত রক্ষা করেননি। সত্য গোপন করার ফলেই সমাজে বাতুলতা (মিথ্যা নিয়ম) মাথাচাড়া দিয়ে ওঠার সুযোগ পেয়েছে।
২. আলেম সমাজের নীরবতা ও স্বার্থসিদ্ধি
অজ্ঞতার কারণে যখন সমাজে ভুল পদ্ধতির প্রচলন শুরু হয়, তখন একদল তথাকথিত আলেম ও ধর্মীয় নেতা প্রতিবাদ না করে বরং নীরবতা পালন করেন। অনেক ক্ষেত্রে আল্লাহর বিধানের ওপর অজ্ঞতার আবরণ থাকাকেই তারা নিজেদের দুনিয়াবি ও অর্থনৈতিক লাভের মাধ্যম হিসেবে গ্রহণ করেন।
৩. মিথ্যা আধ্যাত্মিক আশ্বাস
কিছু ধর্মীয় নেতা নিজেদের সম্পর্কে অবাস্তব ও বানোয়াট প্রচারণা চালান। তারা সাধারণ মানুষকে বোঝাতে চান যে:
তারা অত্যন্ত পূত-পবিত্র সত্তার অধিকারী।
তাদের অনুসারী হলে কিয়ামতের দিন তারা সরাসরি সুপারিশ করে সব গুনাহ মাফ করিয়ে দেবেন।
আল্লাহর কঠোর হুঁশিয়ারি
এই ধরণের মিথ্যা দাবি ও প্রতারণার জবাবে মহান আল্লাহ স্পষ্ট করে দিয়েছেন যে, কিয়ামতের দিন এসব ভণ্ড নেতাদের অবস্থা হবে শোচনীয়:
"আল্লাহ তাদের সাথে কথাই বলবেন না এবং তাদের পবিত্রতার ঘোষণাও দেবেন না।"
অর্থাৎ, যারা দুনিয়াতে ধর্মের নামে মানুষের সাথে প্রতারণা করেছে, পরকালে তারা আল্লাহর রহমত ও ক্ষমা থেকে সম্পূর্ণ বঞ্চিত হবে।
সহীহ হাদীসে সতর্কবাণী
১. তিন ব্যক্তির সাথে আল্লাহ কথা বলবেন না।
রাসূল ﷺ বলেছেন:
“তিন ব্যক্তির সাথে কিয়ামতের দিন আল্লাহ কথা বলবেন না, তাদের দিকে তাকাবেন না এবং তাদের পবিত্র করবেন না।”
তারা হল—
১. অহংকারের কারণে কাপড় টাখনুর নিচে ঝুলিয়ে রাখা ব্যক্তি
২. যে দান করে পরে খোটা দেয়
৩. যে মিথ্যা কসম দিয়ে পণ্য বিক্রি করে (Muslim -১০৬ / Bukhari -২৬৭২)
২. তিন ব্যক্তির প্রতি আল্লাহ তাকাবেন না।
রাসূল ﷺ বলেছেন—
“তিন ব্যক্তির সাথে কিয়ামতের দিন আল্লাহ কথা বলবেন না।”
তারা হল—
১. ব্যভিচারী বৃদ।
২. মিথ্যাবাদী শাসক।
৩. অহংকারী দরিদ্র । (Sahih Muslim —১০৭)
৩. যাদের দিকে আল্লাহ তাকাবেন না
রাসূল ﷺ বলেছেন—
“তিন ব্যক্তির দিকে কিয়ামতের দিন আল্লাহ তাকাবেন না।”
তারা হল—
১. পিতা-মাতার অবাধ্য সন্তান
২. নারীর মত আচরণকারী পুরুষ
৩. দয়ূসঃ যে তার পরিবারের অশ্লীলতা সহ্য করে। (Nasa'i — ২৫৬২/Ahmad — ৬১৮০)
এই শাস্তির ভয়াবহতা
কিয়ামতের দিন মানুষ আল্লাহর রহমতের জন্য অপেক্ষা করবে। কিন্তু যাদের ব্যাপারে বলা হয়েছে আল্লাহ তাদের সাথে কথা বলবেন না, তাদের দিকে তাকাবেন না— তাদের অবস্থা হবে অত্যন্ত ভয়াবহ।
কারণ—
আল্লাহর সাথে কথা বলা মানে তাঁর রহমত পাওয়া
আল্লাহর দৃষ্টি মানে তাঁর সন্তুষ্টি পাওয়া
আল্লাহর পক্ষ থেকে পবিত্র হওয়া মানে জান্নাতের উপযুক্ত হওয়া
আমাদের জন্য শিক্ষা
এই আয়াত ও হাদীসগুলো থেকে মুসলিমদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা হলো—
মিথ্যা কসম থেকে বাঁচতে হবে
ব্যবসায় প্রতারণা করা যাবে না
অহংকার থেকে দূরে থাকতে হবে
পিতা-মাতার অবাধ্য হওয়া যাবে না
দ্বীনের সত্য গোপন করা যাবে না
উপসংহার
দুনিয়ার জীবন অল্প সময়ের। কিন্তু আখিরাতের জীবন অনন্ত। একজন মুমিনের উচিত সব সময় নিজের আমলকে পরিশুদ্ধ রাখা এবং আল্লাহর অসন্তুষ্টি ডেকে আনে এমন কাজ থেকে দূরে থাকা।
আল্লাহ যেন আমাদেরকে সেই সব মানুষের অন্তর্ভুক্ত না করেন যাদের সাথে তিনি কিয়ামতের দিন কথা বলবেন না এবং যাদের দিকে তিনি দৃষ্টি দেবেন না।


কোন মন্তব্য নেই