শাফা‘আত: পরকালে মুক্তির মহাউসিলা
✦ ভূমিকা
মানুষের জীবনে পাপ, ভুল ও দুর্বলতা অবশ্যম্ভাবী। কিন্তু মহান আল্লাহ তাঁর বান্দাদের জন্য রহমতের দরজা খুলে রেখেছেন। সেই রহমতের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো শাফা‘আত (সুপারিশ)।
কিয়ামতের ভয়াবহ দিনে, যখন মানুষ দিশেহারা হয়ে পড়বে, তখন আল্লাহর অনুমতিতে কিছু সম্মানিত বান্দা যাদের জন্য অনুমতি দেওয়া হবে তাদের জন্য সুপারিশ করবেন— আর এটাই হলো শাফা‘আত।
শেষ বিচারের দিন কোনো শাফায়াত বা সুপারিশ ঘটার জন্য দুইটি শর্ত পূর্ণ হতে হবে। উভয় শর্ত সরাসরি আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালার সাথে সম্বন্ধযুক্ত।
প্রথম শর্তঃ আল্লাহ কিছু মানুষকে অনুমতি দিবেন শাফায়াত করার। আল্লাহর অনুমতি ছাড়া তাদের নিজেদের এভাবে বলার অধিকার থাকবে না যে, আল্লাহ আমি চাই অমুক ব্যক্তি জান্নাতে প্রবেশ করুক। না, এরকম বলার অধিকার কারো থাকবে না। একমাত্র আল্লাহ ঐ ব্যক্তিকে অনুমতি দিলে সে শাফায়াত করার সুযোগ পাবে। "হে অমুক! দাঁড়াও এবং অমুকের জন্য সুপারিশ করো।" তখন সে শাফায়াত করতে পারবে।
দ্বিতীয় শর্ত হলোঃ আল্লাহ বলেন- وَ لَا یَشۡفَعُوۡنَ ۙ اِلَّا لِمَنِ ارۡتَضٰی- তারা শুধু তাদের জন্যই সুপারিশ করে যাদের প্রতি তিনি সন্তুষ্ট।(২১:২৮)
আল্লাহ তোমাকে অনুমতি দিবেন বলেই যে তোমার সুপারিশ কবুল হয়ে যাবে ব্যাপারটা এমন নয়।
এর প্রমাণ হলো- وَ کَمۡ مِّنۡ مَّلَکٍ فِی السَّمٰوٰتِ لَا تُغۡنِیۡ شَفَاعَتُهُمۡ شَیۡئًا اِلَّا مِنۡۢ بَعۡدِ اَنۡ یَّاۡذَنَ اللّٰهُ لِمَنۡ یَّشَآءُ وَ یَرۡضٰی
- আর আসমানসমূহে অনেক ফেরেশতা রয়েছে, তাদের সুপারিশ কোনই কাজে আসবে না। তবে আল্লাহ যাকে ইচ্ছা করেন এবং যার প্রতি তিনি সন্তুষ্ট, তার ব্যাপারে অনুমতি দেয়ার পর।(৫৩:২৬)
আর এটা যৌক্তিক মনে হয়। কেউ যদি এভাবে দাঁড়িয়ে বলে- "আমি চাই এই দশ ব্যক্তি জান্নাতে প্রবেশ করুক।" তাহলে এখানে মালিক কে? কে তাহলে রব? বিচার দিনের মালিক কে তাহলে? কে বিচারক? এই ব্যক্তি? অবশ্যই না। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা হলেন মালিক, রব এবং বিচারক। স্পষ্টত কেউ শাফায়াত করলেই যে কবুল হবে তার কোনো গ্যারান্টি নেই।
মূল কথা, আল্লাহ এক দল মানুষকে সুপারিশ করার অনুমতি দিবেন এবং এরপর তিনি যার জন্য ইচ্ছা সুপারিশ কবুল করে নিবেন।
আর, যার জন্যে ইচ্ছা কবুল করবেন না ( এটা তার ইচ্ছা)।
শাফা‘আত কারা করতে পারবে?
১. নবী ও রাসূলগণ (আলাইহিমুস সালাম)।
সব নবী ও রাসূল তাঁদের উম্মতের জন্য সুপারিশ করবেন। তবে আমাদের প্রিয় নবী মুহাম্মাদুর রাসুলুল্লাহ (সা.) করবেন সর্বশ্রেষ্ঠ এবং প্রথম সুপারিশ (শাফা‘আতে কুবরা)।
দলিল: "মানুষ আদম, নূহ, ইবরাহীম, মূসা ও ঈসা (আ.)-এর কাছে যাবে... শেষ পর্যন্ত তারা আমার কাছে আসবে... আমি আরশের নিচে সিজদা করব... তারপর বলা হবে— ‘সুপারিশ করো, তা গ্রহণ করা হবে’।" (সহিহ বুখারি: ৪৭১২)
২. ফেরেশতামণ্ডলী।
আল্লাহর নৈকট্যপ্রাপ্ত ফেরেশতারা মুমিনদের গুনাহ মাফের জন্য আল্লাহর দরবারে সুপারিশ করবেন।
দলিল: "আকাশমণ্ডলীতে কত ফেরেশতা আছে—তাদের সুপারিশ কোনো কাজে আসবে না, যতক্ষণ না আল্লাহ অনুমতি দেন।" (সুরা নাজম: ২৬)
৩. আল-কুরআন এবং সুরাসমূহ।
কুরআন মাজিদ তার পাঠকের পক্ষে আল্লাহর সাথে বিতর্ক করবে এবং তাকে জান্নাতে নেওয়ার সুপারিশ করবে। বিশেষ করে সুরা মুলক এবং সুরা বাকারা ও আলে-ইমরান।
দলিল: "কুরআন পড়ো, কারণ তা কিয়ামতের দিন তার পাঠকারীদের জন্য সুপারিশকারী হিসেবে আসবে।" (সহিহ মুসলিম: ৮০৪)
৪. আল-কুরআনের হাফেজ।
যারা পবিত্র কুরআন মুখস্থ করে এবং সে অনুযায়ী আমল করে, আল্লাহ তাদের সুপারিশ করার বিশেষ মর্যাদা দেবেন।
দলিল: "কুরআনের হাফেজ তার পরিবারের এমন ১০ জন সদস্যের জন্য সুপারিশ করবে, যাদের জন্য জাহান্নাম অবধারিত হয়ে গিয়েছিল।" (জামে তিরমিজি: ২৯০৫) (নোট: এই হাদিসের সনদ নিয়ে আলোচনা থাকলেও কুরআনের সাধারণ ফজিলত প্রমাণিত)
৫. শহীদগণ (যারা আল্লাহর পথে জীবন দিয়েছেন)।
শহীদদের শাফা‘আত অত্যন্ত শক্তিশালী এবং কবুলযোগ্য।
দলিল: "শহীদ ব্যক্তি তার পরিবারের ৭০ জন সদস্যের জন্য শাফা‘আত বা সুপারিশ করবে।" (সুনানে আবু দাউদ: ২৫২২)
৬. নেককার মুমিন, আলেম ও সিদ্দিকগণ।
আল্লাহর প্রিয় ও সৎকর্মশীল বান্দারা হাশরের ময়দানে তাদের পরিচিত ও আত্মীয়দের জন্য সুপারিশ করবেন।
দলিল: "নবিরা শাফা‘আত করবে, ফেরেশতারা করবে এবং মুমিনরাও শাফা‘আত করবে।" (সহিহ মুসলিম: ১৮৩)
৭. মাসুম বা নাবালক শিশু।
যেসব শিশু প্রাপ্তবয়স্ক হওয়ার আগেই মারা গেছে, তারা জান্নাতের দরজায় দাঁড়িয়ে তাদের বাবা-মায়ের জন্য জেদ ধরবে এবং সুপারিশ করবে।
দলিল: "তারা জান্নাতের দরজায় দাঁড়িয়ে থাকবে... এবং তাদের পিতামাতাকে ছাড়া তারা প্রবেশ করবে না।" (মুসনাদে আহমাদ: ১৬২৪৫)
৮. সিয়াম বা রোজা।
রোজা হাশরের ময়দানে সশরীরে উপস্থিত হয়ে বান্দার জন্য সুপারিশ করবে।
দলিল: "রোজা বলবে, 'হে রব! আমি তাকে দিনে পানাহার ও কামাচার থেকে বিরত রেখেছি, তাই তার ব্যাপারে আমার সুপারিশ কবুল করুন'।" (মুসনাদে আহমাদ: ৬৬২৬)

এর মধ্যে সর্বশ্রেষ্ঠ হলো Prophet Muhammad ﷺ-এর শাফা‘আত।
“আমি কিয়ামতের দিনে আদম সন্তানের নেতা হব এবং আমি প্রথম শাফা‘আতকারী,
যার শাফা‘আত গ্রহণ করা হবে(সহিহ মুসলিম: 2278)।”
শাফা‘আতের জন্য শর্ত;
১) আল্লাহর অনুমতি লাগবে।
কে আছে যে তাঁর কাছে সুপারিশ করবে, তাঁর অনুমতি ছাড়া?”(সূরা বাকারা 255)
সেদিন কোনো সুপারিশ কাজে আসবে না, তবে যাকে রহমান অনুমতি দেবেন।
(সূরা ত্বা-হা 109)
“তাদের সুপারিশ কোনো উপকার করবে না, যতক্ষণ না আল্লাহ অনুমতি দেন…”
(সূরা সাবা 23)
২) ঈমান থাকতে হবে।
যে ব্যক্তি ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ’ বলেছে আন্তরিকভাবে, সে আমার শাফা‘আতের সবচেয়ে বেশি হকদার।”(সহিহ বুখারি: 99)
নবী ﷺ বলেন—“আল্লাহ বলবেন: যাও, যার অন্তরে সরিষা দানা পরিমাণ ঈমান আছে তাকে বের করে আনো।”(সহিহ বুখারি: 7439 সহিহ মুসলিম: 183)
৩) আল্লাহ যার উপর সন্তুষ্ট থাকবেন।
তারা শুধু তার জন্যই সুপারিশ করবে, যার প্রতি আল্লাহ সন্তুষ্ট।”(সূরা আম্বিয়া 28)
কারা শাফা‘আত পাবে না:
১. শিরকে লিপ্ত ব্যক্তি।
শাফায়াত পাওয়ার মূল শর্ত হলো তাওহিদ। যারা আল্লাহর সাথে অন্য কাউকে শরিক করে বা শিরকি আকিদা নিয়ে মৃত্যু বরণ করে, তারা নবীজি (সা.)-এর শাফায়াত পাবে না।
দলিল: রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, "প্রত্যেক নবীর একটি কবুল দোয়া থাকে... আমি আমার সেই দোয়াটি কিয়ামতের দিন আমার উম্মতের শাফায়াতের জন্য জমা রেখেছি। আমার উম্মতের মধ্যে যে ব্যক্তি আল্লাহর সাথে কোনো কিছু শরিক না করে মারা যাবে, সে ইনশাআল্লাহ এটি লাভ করবে।" (সহিহ মুসলিম: ১৯৯)
২. কাফের ও মুশরিক।
যারা ইসলামকে অস্বীকার করেছে বা কুফরিতে লিপ্ত থেকেছে, তাদের জন্য কোনো সুপারিশ কাজে আসবে না।
দলিল: "সুতরাং সুপারিশকারীদের সুপারিশ তাদের কোনো উপকারে আসবে না।" (সুরা আল-মুদ্দাসসির: ৪৮)
৩. দ্বীনের মধ্যে নতুন কিছু উদ্ভাবনকারী (বিদআতি)।
যারা নবীজি (সা.)-এর সুন্নাহকে পরিবর্তন করেছে বা দ্বীনের মধ্যে মনগড়া বিষয় (বিদআত) যুক্ত করেছে, কিয়ামতের দিন হাউজে কাউসার থেকে তাদের তাড়িয়ে দেওয়া হবে।
দলিল: নবীজি (সা.) বলবেন, "দূর হও, দূর হও! যারা আমার পরে আমার দ্বীনকে পরিবর্তন করেছ।" (সহিহ বুখারি: ৬৫৭৯)
৪. জালেম ও চরমপন্থী শাসক।
যারা ক্ষমতার অপব্যবহার করে মানুষের ওপর জুলুম করে এবং দ্বীনের ব্যাপারে বাড়াবাড়ি করে, তারা শাফায়াত থেকে বঞ্চিত হতে পারে।
দলিল: নবীজি (সা.) বলেছেন, "আমার উম্মতের দুই শ্রেণির লোক আমার শাফায়াত পাবে না—
(১) অত্যাচারী ও জালেম শাসক এবং
(২) দ্বীনের ব্যাপারে চরমপন্থী ও সীমা লঙ্ঘনকারী ব্যক্তি (গালি) যারা দ্বীন থেকে বেরিয়ে যায়।" (তাবারানি ফিল কাবির: ৮০৭৯)
৫. আমানতের খেয়ানতকারী ও আত্মসাৎকারী।
যাবতীয় সরকারি সম্পদ বা মানুষের আমানত আত্মসাৎকারী ব্যক্তি হাশরের ময়দানে লাঞ্ছিত হবে।
দলিল: হাদিসে এসেছে, কেউ উট বা ছাগল আত্মসাৎ করলে কিয়ামতের দিন তা তার ঘাড়ে সওয়ার হয়ে চিৎকার করতে থাকবে। সে নবীজিকে ডাকলে তিনি বলবেন, "আজ তোমার জন্য আমার কিছুই করার নেই (সুপারিশ করার নেই)।" (সহিহ বুখারি: ৩০৭৩)
৬. ভাগ্যগণনাকারী ও জাদুকর।
কেউ যদি জাদুকর বা গণকের কথা সত্য বলে বিশ্বাস করে, তবে সে ইসলামের মৌলিক আকিদা থেকে বিচ্যুত হয়ে পড়ে।
দলিল: আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, নবীজি (সা.) বলেছেন:
"যে ব্যক্তি কোনো গণক বা জ্যোতিষীর কাছে গেল এবং সে যা বলল তা বিশ্বাস করল, সে যেন মুহাম্মাদ (সা.)-এর ওপর যা নাজিল হয়েছে (কুরআন), তার সাথে কুফরি করল।" (সুনানে আবু দাউদ: ৩৯০৪, মুসনাদে আহমাদ: ৯৫৩২)
ব্যাখ্যা: শাফায়াত পাওয়ার প্রথম শর্ত হলো ইমান। কুফরিতে লিপ্ত ব্যক্তি কোনোভাবেই শাফায়াত পাবে না।
এক নজরে যারা বঞ্চিত হবে:
১)মিথ্যাবাদী ও ধোঁকাবাজ: যারা মানুষকে ঠকায়।
২)অহংকারী ব্যক্তি: যাদের অন্তরে তিল পরিমাণ অহংকার থাকে।
৩)সালাত ত্যাগকারী: ইচ্ছাকৃতভাবে যারা ফরজ নামাজ ছেড়ে দেয় (একদল আলেমের মতে)।
⚠️ খুব ভালোভাবে বুঝবেনঃ
👉 সব মুসলিম শাফা‘আত পাবে—এটা ঠিক না।
👉 আবার সব গুনাহগারও বঞ্চিত—এটাও ঠিক না।
✔ আসল বিষয় হলো:
যার তাওহীদ আছে → সে আশা করতে পারে।
যারা শিরক করেছে → তার কোনো আশা নেই।
শাফায়াত লাভের বিশেষ আমলসমূহ:
১. তাওহিদের ওপর অবিচল থাকা।
শাফায়াত লাভের প্রধান এবং মৌলিক শর্ত হলো শিরকমুক্ত ঈমান। যার অন্তরে বিন্দুমাত্র শিরক থাকবে, সে নবীজি (সা.)-এর শাফায়াত পাবে না।
দলিল: আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, হে আল্লাহর রাসুল! কিয়ামতের দিন আপনার শাফায়াত লাভের মাধ্যমে কোন ব্যক্তি সবচেয়ে বেশি ভাগ্যবান হবে?
রাসুলুল্লাহ (সা.) বললেন:
"যে ব্যক্তি অন্তরের অন্তস্থল থেকে একনিষ্ঠভাবে 'লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ' (আল্লাহ ছাড়া কোনো উপাস্য নেই) বলবে।" (সহিহ বুখারি: ৯৯)
২. আযানের পর মাসনুন দোয়া পাঠ করা।
প্রতিবার আযান শোনার পর দোয়া পড়া একটি সহজ কিন্তু অত্যন্ত শক্তিশালী আমল যা শাফায়াতকে অবধারিত (ওয়াজিব) করে দেয়।
দলিল: জাবের ইবনে আবদুল্লাহ (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, যে ব্যক্তি আযান শুনে আযানের দোয়া পড়বে "কিয়ামতের দিন তার জন্য আমার শাফায়াত হালাল (অবধারিত) হয়ে যাবে।" (সহিহ বুখারি: ৬১৪)
৩. অধিক পরিমাণে দরুদ পাঠ করা।
নবীজি (সা.)-এর প্রতি ভালোবাসা প্রকাশ ও দরুদ পাঠ করলে কিয়ামতের ভয়াবহ মুহূর্তে তাঁর নৈকট্য লাভ করা যায়।
দলিল: আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন:
"কিয়ামতের দিন সেই ব্যক্তি আমার সবচেয়ে নিকটবর্তী হবে, যে আমার ওপর সবচেয়ে বেশি দরুদ পাঠ করবে।" (জামে তিরমিজি: ৪৮৪)
৪. কুরআন বিশেষ করে 'সুরা মুলক' তিলাওয়াত।
কুরআন মাজিদ কিয়ামতের দিন তার পাঠকের জন্য আল্লাহর কাছে ঝগড়া বা বিতর্ক করে তাকে জান্নাতে নিয়ে যাবে।
দলিল: রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন:
"কুরআনে ৩০ আয়াত বিশিষ্ট একটি সুরা আছে, যা কোনো ব্যক্তির জন্য ততক্ষণ সুপারিশ করতে থাকবে যতক্ষণ না তাকে ক্ষমা করা হয়; আর তা হলো সুরা মুলক।
(সুনানে আবু দাউদ: ১৪০০)
৫. মদিনায় বসবাস ও সেখানে মৃত্যু বরণ।
মদিনার প্রতি ভালোবাসা এবং সেখানকার প্রতিকূলতায় ধৈর্য ধারণ করা নবীজির বিশেষ সুপারিশ পাওয়ার মাধ্যম।
দলিল: রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন:
"আমার উম্মতের মধ্যে যারা মদিনার দুঃখ-কষ্টে ধৈর্য ধারণ করবে, কিয়ামতের দিন আমি তাদের জন্য সুপারিশকারী বা সাক্ষী হব।" (সহিহ মুসলিম: ১৩৭৭)
৬. বেশি বেশি নফল নামাজ।
বেশি বেশি নফল ইবাদত ও সিজদা করলে জান্নাতে নবীজির সঙ্গ এবং তাঁর শাফায়াত পাওয়া নিশ্চিত হয়।
দলিল: রাবিয়াহ ইবনে কাব (রা.) জান্নাতে নবীজির সঙ্গ চাইলে রাসুল (সা.) তাকে বলেছিলেন:
"তবে তুমি অধিক পরিমাণে সিজদার (নফল নামাজ) মাধ্যমে এ ব্যাপারে আমাকে সাহায্য
করো (যাতে আমি তোমার জন্য সুপারিশ করতে পারি)।" (সহিহ মুসলিম: ৪৮৯)
৭. সিয়াম বা রোজা রাখা।
রোজা হাশরের ময়দানে আল্লাহর দরবারে বান্দার জন্য কথা বলবে।
দলিল: রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, "কিয়ামতের দিন রোজা এবং কুরআন বান্দার জন্য সুপারিশ করবে। রোজা বলবে, 'হে রব! আমি তাকে দিনে পানাহার ও কামাচার থেকে বিরত রেখেছি, তাই তার ব্যাপারে আমার সুপারিশ কবুল করুন'।" (মুসনাদে আহমাদ: ৬৬২৬)
৮. সৎ ও নেককার বন্ধুদের সান্নিধ্য।
আল্লাহর জন্য যারা একে অপরকে ভালোবাসে, তারা একে অপরের জন্য সুপারিশ করতে পারবে।
দলিল: হাসান বসরী (রহ.) বলতেন, "তোমরা বেশি বেশি নেককার বন্ধু বানাও, কারণ কিয়ামতের দিন তাদের শাফায়াত করার অধিকার থাকবে।" (তাফসিরে কুরতুবি)
৯. ধৈর্য ধারণ করা (বিশেষ করে সন্তান হারানোয়)।
যদি কোনো মুসলিমের নাবালক সন্তান মারা যায় এবং সে ধৈর্য ধরে, তবে সেই সন্তান তার মা-বাবার জন্য শাফায়াত করবে।
দলিল: নবীজি (সা.) বলেছেন, "যার তিনটি (নাবালক) সন্তান মারা যাবে, তারা তার জন্য জাহান্নামের বিরুদ্ধে ঢাল হয়ে দাঁড়াবে।" (সহিহ বুখারি: ১২৫১)
১০. হজের পর মদিনায় নবীজি (সা.)-এর কবর জিয়ারত।
এটি একটি অত্যন্ত ফজিলতপূর্ণ আমল যা শাফায়াত ত্বরান্বিত করে।
দলিল: রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, "যে ব্যক্তি আমার ওফাতের পর আমার কবর জিয়ারত করল, সে যেন আমার জীবদ্দশায় আমাকে দেখল। আর যে আমার কবর জিয়ারত করবে, তার জন্য আমার শাফায়াত ওয়াজিব হয়ে যাবে।" (শুআবুল ঈমান: ৩৮৬২, দারা কুতনি)
১১. বড় গুনাহ থেকে বেঁচে থাকা।
যারা কবিরা গুনাহ থেকে বেঁচে থাকে এবং তাওহিদের ওপর থাকে, তারা নবীজির বিশেষ শাফায়াতের হকদার।
দলিল: রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, "আমার শাফায়াত আমার উম্মতের ওই সব লোকদের জন্য, যারা কবিরা গুনাহে লিপ্ত ছিল (কিন্তু ইমান হারায়নি)।" (সুনানে আবু দাউদ: ৪৭৩৯)
১২. বেশি বেশি ইস্তিগফার (ক্ষমা প্রার্থনা)।
যারা আল্লাহর কাছে বারবার ক্ষমা চাই, আরশ বহন কারি ফেরেশতারা স্তারা সেই সব বান্দার জন্য ক্ষমার দোয়া করেন।
দলিল:"যারা আরশ বহন করে এবং যারা তার চারপাশে আছে... তারা মুমিনদের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা (ইস্তিগফার) করে বলে: 'হে আমাদের পালনকর্তা! আপনার রহমত ও জ্ঞান সবকিছুতে পরিব্যাপ্ত। অতএব, যারা তওবা করে এবং আপনার পথে চলে, তাদের আপনি ক্ষমা করুন এবং জাহান্নামের আজাব থেকে রক্ষা করুন'।" (সুরা গাফির: ৭)
১৩. দ্বীনি ইলম অর্জন ও প্রচার করা।
আলেম এবং দ্বীনের জ্ঞান অর্জনকারীরা কিয়ামতের দিন সুপারিশ করার সুযোগ পাবেন।
দলিল: রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন:
"কিয়ামতের দিন তিন শ্রেণির লোক শাফায়াত করবে— আম্বিয়া (আলাইহিমুস সালাম), এরপর উলামায়ে কেরাম, এরপর শহীদগণ।"
(সুনানে ইবনে মাজাহ: ৪৩১৩)
১৪. আল্লাহর পথে শাহাদাত বরণ করা।
শহীদের শাফায়াত অত্যন্ত শক্তিশালী। একজন শহীদ তার পরিবারের অনেক সদস্যের জন্য সুপারিশ করতে পারবেন।
দলিল: নবীজি (সা.) বলেছেন: "শহীদ ব্যক্তি তার পরিবারের ৭০ জন সদস্যের জন্য শাফায়াত করবে।" (সুনানে আবু দাউদ: ২৫২২)
১৫. আজান দেওয়া (মুয়াজ্জিন হওয়া)।
মুয়াজ্জিনদের মর্যাদা কিয়ামতের দিন অনেক উচ্চে থাকবে এবং তাদের আজান যারা শুনেছে তারা তাদের জন্য সাক্ষী হবে।
দলিল: রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন: "কিয়ামতের দিন মুয়াজ্জিনদের ঘাড় সব মানুষের চেয়ে দীর্ঘ হবে (অর্থাৎ তারা বিশেষ মর্যাদায় সমাসীন হবে)।" (সহিহ মুসলিম: ৩৮৭)
১৬. ন্যায়ের পথে চলা ও সত্যবাদিতা।
যারা দুনিয়াতে সত্য কথা বলে এবং আমানত রক্ষা করে, তাদের জন্য শাফায়াত সহজ হয়। কারণ হাশরের ময়দানে আল্লাহ তায়ালা সত্যবাদীদের সত্যের পুরস্কার দেবেন।
দলিল: পবিত্র কুরআনে বলা হয়েছে, "পরম দয়াময় আল্লাহর নিকট থেকে যারা প্রতিশ্রুতি গ্রহণ করেছে তারা ছাড়া আর কেউ শাফায়াতের অধিকারী হবে না।" (সুরা মারইয়াম: ৮৭)
১৭. কুরআন হিফজ করা (হাফেজ হওয়া)।
কুরআনের হাফেজরা আল্লাহর অনুমতিতে তাদের পরিবারের জন্য সুপারিশ করতে পারবেন।
দলিল: হাদিসে এসেছে, যে ব্যক্তি কুরআন পাঠ করে এবং তা মুখস্থ করে... আল্লাহ তাকে জান্নাতে প্রবেশ করাবেন এবং তার পরিবারের এমন ১০ জন সদস্যের ব্যাপারে তার সুপারিশ কবুল করবেন যাদের জন্য জাহান্নাম অবধারিত হয়ে গিয়েছিল।
(জামে তিরমিজি: ২৯০৫)
নোট: এই হাদিসটির সনদ নিয়ে মুহাদ্দিসদের মধ্যে আলোচনা থাকলেও কুরআন হিফজের সাধারণ ফজিলত সর্বজনবিদিত।
১৮. হাজীদের সুপারিশ।
যারা বিশুদ্ধভাবে হজ পালন করেন (হজে মাবরুর), তাদের দোয়া ও সুপারিশ আল্লাহর কাছে অত্যন্ত গ্রহণযোগ্য।
দলিল: রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, "হাজী ব্যক্তি তার পরিবারের ৪০০ সদস্যের জন্য সুপারিশ করবে।" (মুসনাদে বাজ্জার: ৩১৯৭)
১৯. মুমিনদের একে অপরের জন্য জানাজার দোয়া।
জানাজার নামাজে যখন একদল ইমানদার ব্যক্তি মৃত ব্যক্তির জন্য নিষ্ঠার সাথে দোয়া করে, তা তার জন্য শাফায়াত হিসেবে কবুল হয়।
দলিল: নবীজি (সা.) বলেছেন, "কোনো মুসলিম মারা গেলে যদি এমন ৪০ জন ব্যক্তি তার জানাজায় দাঁড়ায় যারা আল্লাহর সাথে কাউকে শরিক করে না, তবে আল্লাহ তাদের সুপারিশ কবুল করেন।" (সহিহ মুসলিম: ৯৪৮)
২০.শাফায়াত লাভের বিশেষ দোয়া ও আল্লাহর নাম।
নবীজি (সা.) শিখিয়েছেন যে, আল্লাহর বিশেষ নামের উসিলা দিয়ে দোয়া করলে তা ফিরিয়ে দেওয়া হয় না।
দলিল: আনাস (রা.) থেকে বর্ণিত, এক ব্যক্তি দোয়া করছিল— অর্থাৎ: হে আল্লাহ! আমি আপনার কাছে প্রার্থনা করছি এই উসিলায় যে, সব প্রশংসা আপনারই, আপনি ছাড়া কোনো উপাস্য নেই, আপনি পরম দাতা।
নবীজি (সা.) তা শুনে বললেন:
"সে আল্লাহর এমন 'ইসমুল আজম' (মহা নাম) দিয়ে দোয়া করেছে, যা দিয়ে ডাকলে তিনি সাড়া দেন এবং যা দিয়ে চাইলে তিনি দান করেন।" (সুনানে আবু দাউদ: ১৪৯৫, তিরমিজি: ৩৫৪৪)
শাফায়াতের সাথে সম্পর্ক: কিয়ামতের দিন নবীজি (সা.) যখন সিজদায় পড়ে শাফায়াতের অনুমতি চাইবেন, তখন তিনি আল্লাহর এমন কিছু 'হামদ' বা প্রশংসামূলক নাম দিয়ে ডাকবেন যা আগে কাউকে শেখানো হয়নি। সুতরাং যারা দুনিয়াতে আসমাউল হুসনার উসিলায় আল্লাহর প্রশংসা করবে, তারা সেই বিশেষ রহমতের নিকটবর্তী হবে।
উপসংহার:
পরকালের মুক্তি কেবল আল্লাহর রহমতের ওপর নির্ভরশীল। শাফা‘আত সেই রহমতেরই একটি অংশ। আসুন, আমরা শিরক ও বিদআত বর্জন করে সুন্নাহ অনুযায়ী জীবন সাজাই, যেন কিয়ামতের ভয়াবহ দিনে নবীজি (সা.)-এর শাফা‘আত লাভ করতে পারি।
এর মধ্যে সর্বশ্রেষ্ঠ হলো Prophet Muhammad ﷺ-এর শাফা‘আত।
শাফায়াত লাভের বিশেষ আমলসমূহ:

কোন মন্তব্য নেই