কুরআন না শেখার করুণ পরিণতি |
কুরআন না শেখার করুণ পরিণতি — এক হৃদয়বিদারক বাস্তবতা
🔹 মুসলমান জাতি, কিন্তু কুরআন অজানা!
বাংলাদেশ পৃথিবীর দ্বিতীয় বৃহত্তম মুসলিম দেশ। এদেশের শতকরা ৯০ থেকে ৯৫ জনই মুসলমান। কিন্তু দুঃখের বিষয় হলেও সত্যি যে, মুসলমানদের মধ্যে ৮০ থেকে ৮৫ ভাগ মুসলমান কুরআন তিলাওয়াত করতে পারে না। এর মধ্যে যারা কুরআন জানে, তারা আবার শুদ্ধ করে পারে না। এটা কেবল অজ্ঞতা নয় — এটা এক চরম গাফেলতি।
ব্যাখ্যা: মুসলমান হিসেবে আমাদের প্রধান দায়িত্ব হলো আল্লাহ তা'আলার কিতাব কুরআনকে জানা, বোঝা এবং এর নির্দেশনা অনুযায়ী জীবন পরিচালনা করা। দুঃখজনকভাবে, মুসলিম বিশ্বের একটি বৃহৎ অংশে, বিশেষ করে বাংলাদেশে, কুরআনের প্রাথমিক জ্ঞানটুকুও অনুপস্থিত। এই অবস্থা কেবল অজ্ঞতা নয়, বরং আল্লাহর কালামের প্রতি এক চরম অবহেলা এবং উদাসীনতা, যা ব্যক্তিগত ও সামগ্রিক জীবনে বড় ধরনের নেতিবাচক প্রভাব ফেলে।
🔹 কুরআন না জানা = চোখ কানা, কান বধির
আল্লাহ তা’য়ালা সূরা হুদের আয়াত-২৪ এ বলেন:
مَثَلُالْفَرِیْقَیْنِكَالْاَعْمٰىوَالْاَصَمِّوَالْبَصِیْرِوَالسَّمِیْعِ١ؕهَلْیَسْتَوِیٰنِمَثَلًا١ؕاَفَلَاتَذَكَّرُوْنَ۠“কুরআন জানা এবং না জানাদের উদাহরণ হলো এক লোক অন্ধ ও বধির এবং অন্যজন চক্ষুষ্মান ও শ্রবণশক্তিসম্পন্ন। এরা দুজন কি সমান হতে পারে? তবুও কি তোমরা শিক্ষা গ্রহণ করো না?”
ব্যাখ্যা: এই আয়াতে আল্লাহ তা'আলা কুরআন সম্পর্কে জ্ঞান রাখা এবং না রাখার একটি সুস্পষ্ট উপমা দিয়েছেন। যে ব্যক্তি কুরআন জানে না, সে যেন অন্ধ এবং বধিরের মতো, যে সত্যকে দেখতে বা শুনতে পায় না। পক্ষান্তরে, যে ব্যক্তি কুরআন জানে এবং বোঝে, সে চক্ষুষ্মান ও শ্রবণশক্তির অধিকারী ব্যক্তির মতো, যে সত্যকে অনুধাবন করতে পারে। এই দুই শ্রেণির মানুষ কখনোই সমান হতে পারে না, যেমন একজন সুস্থ মানুষের সাথে একজন অক্ষম মানুষের তুলনা চলে না। আল্লাহ এই উপমার মাধ্যমে আমাদের চিন্তা করতে বলছেন যে আমরা কোন শ্রেণির অন্তর্ভুক্ত হতে চাই।
🔹 সত্য জানার গুরুত্ব
সূরা আর-রাদ: আয়াত: ১৯ আল্লাহ তাআলা বলেন:
اَفَمَنْیَّعْلَمُاَنَّمَاۤاُنْزِلَاِلَیْكَمِنْرَّبِّكَالْحَقُّكَمَنْهُوَاَعْمٰى١ؕاِنَّمَایَتَذَكَّرُاُولُواالْاَلْبَابِۙ“আচ্ছা তোমার রবের পক্ষ থেকে তোমার ওপর যে কিতাব নাযিল হয়েছে, তাকে যে ব্যক্তি সত্য মনে করে আর যে ব্যক্তি এ সত্যটির ব্যাপারে অন্ধ, তারা দু’জন সমান হবে, এটা কেমন করে সম্ভব? উপদেশ তো শুধু বিবেকবান লোকেরাই গ্রহণ করে।”
ব্যাখ্যা: এই আয়াতে আল্লাহ বলছেন যে, আল্লাহর পক্ষ থেকে প্রেরিত কুরআন যে সত্য, তা যে ব্যক্তি জানে এবং স্বীকার করে, আর যে ব্যক্তি এই সত্য সম্পর্কে অন্ধ, তারা কখনোই সমান হতে পারে না। কুরআন হলো জীবন পরিচালনার একমাত্র সত্য পথ, আর যে এই পথ সম্পর্কে অজ্ঞ বা উদাসীন, সে যেন জীবনের ভুল পথে চলছে। আল্লাহ জোর দিয়ে বলছেন যে, কেবল বিবেকবান লোকেরাই এই উপদেশ গ্রহণ করে। যারা তাদের বুদ্ধি ও চিন্তাশক্তিকে কাজে লাগিয়ে কুরআনের গুরুত্ব অনুধাবন করতে পারে, তারাই সত্যিকারের জ্ঞানী।
🔹 অন্ধ ও আলোর পার্থক্য
সূরা ফাতির: আয়াত: ১৯-২৩:
وَمَایَسْتَوِیالْاَعْمٰىوَالْبَصِیْرُۙ"অন্ধ ও চক্ষুষ্মান সমান নয়",
وَلَاالظُّلُمٰتُوَلَاالنُّوْرُۙ"না অন্ধকার ও আলো সমান",
وَلَاالظِّلُّوَلَاالْحَرُوْرُۚ"না শীতল ছায়া ও রোদের তাপ",
وَمَایَسْتَوِیالْاَحْیَآءُوَلَاالْاَمْوَاتُ١ؕاِنَّاللّٰهَیُسْمِعُمَنْیَّشَآءُ١ۚوَمَاۤاَنْتَبِمُسْمِعٍمَّنْفِیالْقُبُوْرِ“না জীবিত ও মৃতরা সমান। আল্লাহ যাকে চান শোনান, কিন্তু (হে নবী!) তুমি তাদেরকে শুনাতে পারো না যারা কবরে শায়িত রয়েছে।”
ব্যাখ্যা: এই আয়াতগুলোতে আল্লাহ বিভিন্ন বৈপরীত্যের উদাহরণ তুলে ধরেছেন—যেমন অন্ধ ও চক্ষুষ্মানের পার্থক্য, অন্ধকার ও আলোর পার্থক্য, শীতল ছায়া ও রৌদ্রের তাপের পার্থক্য, এবং জীবিত ও মৃতের পার্থক্য। এর মাধ্যমে আল্লাহ বোঝাতে চেয়েছেন যে, কুরআনের জ্ঞান হলো আলোর মতো, যা মানুষকে সঠিক পথ দেখায়। আর কুরআন থেকে বিমুখতা হলো অন্ধকারের মতো, যা মানুষকে ভ্রষ্টতার দিকে নিয়ে যায়। যারা কুরআনের কথা শোনে না, তারা যেন জীবিত থেকেও মৃতের মতো, যারা কোনো উপদেশ বা দিকনির্দেশনা গ্রহণ করতে অক্ষম।
🔹 যিকির থেকে মুখ ফিরালে সংকীর্ণ জীবন
সূরা ত্ব-হা আয়াত ১২৪-১২৬:
وَمَنْاَعْرَضَعَنْذِكْرِیْفَاِنَّلَهٗمَعِیْشَةًضَنْكًاوَّنَحْشُرُهٗیَوْمَالْقِیٰمَةِاَعْمٰى“আর যে ব্যক্তি আমার যিকির থেকে মুখ ফিরিয়ে নেবে তার জন্য হবে দুনিয়ায় সংকীর্ণ জীবন এবং কিয়ামতের দিন আমি তাকে উঠাব অন্ধ করে।”
দুনিয়ায় মানসিক স্থিরতা লাভ করতে পারবে না। পার্থিব সাফল্য আসবে অবৈধ পন্থায়। জীবনে থাকবে চরম অস্থিরতা।
قَالَرَبِّلِمَحَشَرْتَنِیْۤاَعْمٰىوَقَدْكُنْتُبَصِیْرًا-সে বলবে, “হে আমার রব! দুনিয়ায় তো আমি চক্ষুষ্মান ছিলাম কিন্তু এখানে আমাকে অন্ধ করে উঠালে কেন?”
قَالَكَذٰلِكَاَتَتْكَاٰیٰتُنَافَنَسِیْتَهَا١ۚوَكَذٰلِكَالْیَوْمَتُنْسٰىআল্লাহ বলবেন, “হ্যাঁ, এভাবেই তো। আমার আয়াত যখন তোমার কাছে এসেছিল, তুমি তাকে ভুলে গিয়েছিলে এবং আজ তুমিও ভুলে যাওয়া হচ্ছে।”
ব্যাখ্যা: এখানে 'যিকির' বলতে শুধু আল্লাহর নাম জপা নয়, বরং কুরআনের অধ্যয়ন, এর নির্দেশাবলি স্মরণ রাখা এবং সে অনুযায়ী জীবনযাপন করাকে বোঝানো হয়েছে। যে ব্যক্তি কুরআন থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয়, তার জীবন দুনিয়াতে অস্থিরতা ও অশান্তিতে ভরে যায়, যদিও বাহ্যিকভাবে সে সম্পদশালী বা সফল মনে হতে পারে। আখিরাতে তাকে অন্ধ করে উঠানো হবে, কারণ সে দুনিয়াতে আল্লাহর নিদর্শনাবলী দেখেও দেখেও অন্ধের মতো ছিল। সেদিন তার আক্ষেপ কোনো কাজে আসবে না।
🔹 কুরআন বিমুখতা মানে শয়তানই সঙ্গী
সূরা আয-যুখরুফ আয়াত ৩৬-৩৯:
وَمَنْیَّعْشُعَنْذِكْرِالرَّحْمٰنِنُقَیِّضْلَهٗشَیْطٰنًافَهُوَلَهٗقَرِیْنٌ“যে ব্যক্তি কুরআন থেকে গাফিল থাকে আমি তার ওপর এক শয়তান চাপিয়ে দেই, সে তার বন্ধু হয়ে যায়।”
ব্যাখ্যা: যে ব্যক্তি আল্লাহর কুরআন থেকে গাফিল বা উদাসীন থাকে, আল্লাহ তার ওপর একটি শয়তানকে চাপিয়ে দেন, যা তার অন্তরঙ্গ বন্ধু হয়ে যায়। এই শয়তান তাকে সত্য থেকে দূরে সরিয়ে দেয়, তাকে ভুল পথে পরিচালিত করে এবং খারাপ কাজে প্ররোচিত করে। ফলস্বরূপ, সে ব্যক্তি আল্লাহর স্মরণ থেকে দূরে চলে যায় এবং নিজের অজ্ঞাতেই শয়তানের অনুসরণকারী হয়ে পড়ে।
🔹 কিয়ামতের দিন ভয়াবহ আফসোস
সূরা আল-ফুরকান: আয়াত: ২৭-৩০:
“হায়! যদি আমি রসুলের সহযোগী হতাম।”
“হায়! আমি অমুককে বন্ধু না বানালে ভালো হতো।”
“রসূল বলবে, হে আমার রব! আমার কওম এই কুরআনকে পরিত্যাগ করেছে।”
ব্যাখ্যা: কিয়ামতের দিন মানুষ যখন তাদের কৃতকর্মের ফল দেখতে পাবে, তখন তারা সীমাহীন আফসোস করবে। বিশেষ করে, যারা দুনিয়াতে কুরআনকে অবহেলা করেছে, নবীর পথ অনুসরণ করেনি, এবং মন্দ বন্ধুদের পাল্লায় পড়েছিল, তারা সেদিন চরম অনুতাপ করবে। সেদিন রাসূলুল্লাহ (সা.) আল্লাহর কাছে অভিযোগ করবেন যে, তার উম্মত কুরআনকে পরিত্যাগ করেছিল। এই আয়াতগুলো কুরআনের প্রতি উদাসীনতার চূড়ান্ত পরিণতির কথা স্মরণ করিয়ে দেয়।
🔹 মহাবিপদের একমাত্র কারণ—কুরআন পরিত্যাগ
ইবন কাসীর (রহ.) বলেন, “কুরআন না পড়া, অনুসরণ না করা, হেদায়াত গ্রহণ না করাই কুরআন পরিত্যাগ।”
ব্যাখ্যা: প্রখ্যাত তাফসীরকার ইমাম ইবন কাসীর (রহ.) কুরআনের পরিত্যাগকে শুধু এটিকে স্পর্শ না করা বা না পড়া হিসেবে দেখেননি। বরং তাঁর মতে, কুরআনকে পরিত্যাগ করার অর্থ হলো এর আয়াতগুলো না বোঝা, এর নির্দেশনাগুলো অনুসরণ না করা এবং এর থেকে হেদায়েত গ্রহণ না করা। অর্থাৎ, কুরআন থেকে মুখ ফিরিয়ে নেওয়া, এর উপদেশ থেকে শিক্ষা না নেওয়া এবং এটিকে জীবনে বাস্তবায়ন না করাই প্রকৃত অর্থে কুরআন পরিত্যাগ।
🔹 জাহান্নামের ভাষা ও মানুষের জবাব
সূরা আল-মুলক: আয়াত: ৮-১১:
তাদের বলা হবে, “তোমাদের কাছে কি কেউ সাবধানকারী আসেনি?”
তারা বলবে, “হ্যাঁ, এসেছিল। কিন্তু আমরা তাকে মিথ্যাবাদী বলেছি।”
“আহা! যদি আমরা শুনতাম, বিবেক দিয়ে বুঝতাম, তাহলে আজ এই সাজাপ্রাপ্তদের মধ্যে থাকতাম না।”
ব্যাখ্যা: জাহান্নামে প্রবেশের পর অপরাধীদের প্রশ্ন করা হবে যে, তাদের কাছে কি আল্লাহর পক্ষ থেকে কোনো সতর্ককারী আসেনি? তখন তারা স্বীকার করবে যে, হ্যাঁ, এসেছিল, কিন্তু তারা তাদেরকে মিথ্যাবাদী প্রতিপন্ন করেছিল এবং তাদের কথা শোনেনি। সেদিন তারা আক্ষেপ করে বলবে যে, যদি তারা সতর্কবাণী শুনত এবং বিবেক দিয়ে বুঝত, তাহলে আজ তারা জাহান্নামের শাস্তিপ্রাপ্তদের অন্তর্ভুক্ত হতো না। এটি আমাদের জন্য এক কঠিন সতর্কবার্তা যে, দুনিয়াতে যখন আল্লাহর নিদর্শনাবলী এবং সতর্কবাণী আসে, তখন তা মনোযোগ দিয়ে শোনা ও অনুধাবন করা কত জরুরি।
🔹 হাদীস: কুরআন জান্নাতে টেনে নেয় কিংবা জাহান্নামে নিক্ষেপ করে
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন:
«الْقُرْآنُشَافِعٌمُشَفَّعٌ...»“কুরআন সুপারিশকারী, যে অনুসরণ করবে তাকে জান্নাতে নেবে। আর যে পেছনে ফেলবে, তাকে জাহান্নামে ফেলবে।” (সহীহ ইবনে হিববান: ১২৪)
ব্যাখ্যা: এই হাদীসে রাসূলুল্লাহ (সা.) কুরআনের দুটি বিপরীতমুখী ভূমিকা উল্লেখ করেছেন। যারা দুনিয়াতে কুরআনকে তাদের পথপ্রদর্শক হিসেবে গ্রহণ করবে, এর বিধানগুলো মেনে চলবে এবং এটিকে তাদের জীবনের অংশ করে নেবে, কিয়ামতের দিন কুরআন তাদের জন্য সুপারিশকারী হবে এবং তাদের জান্নাতে নিয়ে যাবে। পক্ষান্তরে, যারা কুরআনকে অবহেলা করবে, এর নির্দেশাবলিকে পেছনে ফেলে দেবে এবং এটি থেকে মুখ ফিরিয়ে নেবে, কুরআন তাদের বিরুদ্ধে সাক্ষী দেবে এবং তাদের জাহান্নামে নিক্ষেপ করবে।
🔹 শেষ কথা: শেখো ও শেখাও
আবদুল্লাহ ইবনে আমর (রাঃ) বলেন:
«عَلَيْكُمبِالْقُرْآنِ،فَتَعَلَّمُوْهُوَعَلِّمُوْهُأَبْنَائَكُمْ...»“তোমরা কুরআন শিক্ষা করো, সন্তানদের শেখাও। এ বিষয়ে জিজ্ঞাসা করা হবে এবং প্রতিদান দেওয়া হবে।”
ব্যাখ্যা: এই উক্তিটি কুরআনের জ্ঞান অর্জন এবং বিতরণের গুরুত্বকে জোরালোভাবে তুলে ধরে। এটি শুধু ব্যক্তিগতভাবে কুরআন শেখার কথাই বলে না, বরং আমাদের সন্তানদেরও শেখানোর ওপর জোর দেয়। একজন মুসলিম হিসেবে, আমাদের ওপর আল্লাহর পক্ষ থেকে কুরআন শেখার এবং শেখানোর দায়িত্ব অর্পিত হয়েছে। কিয়ামতের দিন এই বিষয়ে জিজ্ঞাসা করা হবে এবং যারা এই দায়িত্ব পালন করবে, তাদের জন্য রয়েছে মহাপুরস্কার। তাই আসুন, আমরা নিজেরা কুরআন শিখি এবং আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মকেও এর আলোতে আলোকিত করি।
🕋 আল্লাহ আমাদের কুরআন শিখে সে অনুযায়ী পথ চলার তাওফিক দান করুন। আমিন।


কোন মন্তব্য নেই