নেতৃত্ব বনাম দায়িত্ব
নেতৃত্ব বনাম দায়িত্ব: এক মনোজাগতিক ভুলভাঙার দরকার
নেতৃত্ব আর দায়িত্ব—দু’টো শব্দ, কিন্তু ভিন্ন জগতের বাসিন্দা।
যেভাবে রাসূলুল্লাহ ﷺ কুরাইশ নেতা আবু জেহেলের হাত থেকে নেতৃত্ব কেড়ে নিয়েছিলেন, আর যেভাবে আবু বকর (রা.) নবিজির হাত থেকে দায়িত্ব পেয়েছিলেন—এই দুই উদাহরণ একই শব্দে বাঁধা থাকলেও বাস্তবে বিপরীতমুখী গল্প বলে।
🔺 নবিজি ﷺ-র নেতৃত্ব ছিল ছিনিয়ে আনা এক জাহেলি ক্ষমতার কেন্দ্র থেকে।
ওখানে লড়াই ছিল, ঘোষণা ছিল, প্রত্যাশা ছিল—"হ্যাঁ, আমরা মুহাম্মাদকে নেতা বানাতে চাই!"
মাঠ ছিল উত্তপ্ত। প্রতিপক্ষ জানত, কে তাদের সিংহাসনের জন্য হুমকি।
নবিজি ﷺ ছিলেন স্পষ্টভাবে প্রো-একটিভ, মাস্টারপ্ল্যান হাতে। এখানে নেতৃত্ব ছিল ‘চেষ্টা করে অর্জন’ করার মতো জিনিস।
🔻 আবু বকর (রা.)-এর নেতৃত্ব ছিল দায়িত্ব হিসেবে চাপিয়ে দেওয়া—
তাঁর চাওয়া বা আকাঙ্ক্ষা নয়। এখানে কাউন্সিল ছিল, শূরা ছিল, বিকল্প প্রার্থী ছিল।
কেউ চাইলে নেতা হতে পারতেন, কিন্তু কেউ চাইত না—কারণ এটি ছিল ‘বোঝা’, ‘জবাবদিহি’, ‘দায়ভার’।
তাই একে বলা যায় “নেতৃত্বের দায়”—এখানে প্রো-একটিভ চাওয়ার চেয়ে রিসপনসিভ দায়িত্ব পালনই মুখ্য।
আজকের বাস্তবতায় প্রশ্ন দাঁড়ায়—আমরা কোন পথে হাঁটছি?
আমরা কি জাহেলিয়াতের শক্ত হাতে গড়া সিস্টেম ভেঙে ইসলামি নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠা করতে চাইছি?
নাকি আমরা সেই প্রতিষ্ঠিত ইসলামী কাঠামোর ভেতরে দায়িত্ব হস্তান্তর দেখতে চাই?
দুটো রাস্তাই ভিন্ন।
একটা হলো প্রো-একটিভ নেতৃত্ব: মুখোমুখি চ্যালেঞ্জ, স্ট্র্যাটেজিক অগ্রযাত্রা।
অন্যটা হলো অভ্যন্তরীণ দায়িত্বের হস্তান্তর: শৃঙ্খলাবদ্ধ, নিরব, নিঃশব্দ এক প্রক্রিয়া।
এখনকার দুর্ভাগ্য হলো—অনেকে এই দুই জিনিসকে এক মনে করেন।
অভ্যন্তরীণ সংগঠন যেমন নীরবভাবে দায়িত্ব হস্তান্তর করে,
তেমনই মনে করেন সমাজও নেতৃত্ব তুলে দেবে বিনা কষ্টে, বিনা রক্তে।
এই ভুল ধারণার ফলেই—আমরা আজ নেতৃত্বশূন্য এক মুমূর্ষু কাফেলার মতো।
প্রো-একটিভভাবে নেতৃত্বে যেতে চাইলেই ট্যাগ পড়ে:
“নেতৃত্বপিপাসু”, “প্রসিদ্ধিলোভী”, “রিয়া আক্রান্ত”।
একজন ইসলামপন্থী তরুণ যদি স্বপ্ন দেখে—"আমি সমাজে নেতৃত্ব দিতে চাই",
তাকে সন্দেহের চোখে দেখা হয়।
এমনকি নিজের মাঝেই সে একধরনের অপরাধবোধ পুষে রাখতে থাকে।
সিস্টেম তাকে শেখায়, “নেতৃত্ব চাওয়া হারাম”, “নেতৃত্ব চাইলে তুমি ফিতনার উৎস”।
অথচ বাস্তবতা বলছে—এই দুনিয়ার নেতৃত্ব ছিনিয়ে নিতে হয়।
প্রতিপক্ষ শিকড় গেড়ে বসে আছে সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে।
তারা আপনাকে হ্যান্ডওভার করে যাবে না নেতৃত্ব।
আপনাকে স্ট্র্যাটেজি নিতে হবে, প্রো-একটিভ হতে হবে, মাঠে নামতে হবে।
নির্দিষ্ট কোনো এক সময় কেউ দায়িত্ব দিলেই তখন লাফিয়ে উঠা যাবে—এমন ফ্যান্টাসি ভাঙার সময় এখন।
ভাইয়েরা, প্রো-একটিভ হোন। লুকিয়ে থাকা যথেষ্ট হয়েছে।
নিজের জনপদের জন্য মাস্টারপ্ল্যান বানান।
নেতৃত্ব মানে ক্ষমতার লালসা না—নেতৃত্ব মানে এক বিশাল দায়িত্বের ভার নিজ কাঁধে তোলা।
অভ্যন্তরীণ আনুগত্য বজায় রেখেই বৃহৎ সমাজ পরিবর্তনের যাত্রা শুরু করুন।
দায়িত্ব ও নেতৃত্ব—এই দুটো টার্ম হৃদয়ের গভীর থেকে বুঝুন।
তাহলেই ইন শা আল্লাহ, একদিন ইতিহাসের পাতায় আমরা লিখতে পারবো—
"তারা ছিল সেই প্রজন্ম, যারা নেতৃত্বকে ভয় পেত না; দায়িত্বকে ভালবাসত।"

কোন মন্তব্য নেই