মূসা (আ.) এর সাতটি মোজেজা ।

 

বনী ইসরাঈলের সামনে হযরত মূসা (আ.)-এর মাধ্যমে প্রদর্শিত সাতটি মোজেজা – কুরআনের আলোকে ঘটনা সহকারে 

এগুলো শুধুই ইতিহাস না, এগুলো আল্লাহর পক্ষ থেকে বারবার সাবধানবানী। অহংকারের পতনের প্রতীক।

1️⃣ যাদুকরদের পরাজয় ও ঈমান আনা

📖 আয়াত:

﴿فَأُلْقِيَ السَّحَرَةُ سُجَّدًا ۖ قَالُوا آمَنَّا بِرَبِّ هَارُونَ وَمُوسَى﴾
“যাদুকররা সিজদায় লুটিয়ে পড়ল এবং বলল, আমরা ঈমান আনলাম হারুন ও মূসার রবের প্রতি।”
— সূরা ত্বাহা, আয়াত ৭০

📜 ঘটনা:
ফেরাউন হযরত মূসাকে চ্যালেঞ্জ দিয়ে যাদুকরদের ডেকে আনে। তারা দড়ি ও লাঠি ছুড়ে দেয়, চোখের জাদুতে সাপ হয়ে নাচে। কিন্তু মূসা (আ.) যখন আল্লাহর আদেশে তাঁর লাঠি নিক্ষেপ করেন, তা আসলেই সাপ হয়ে যাদুকরদের জাদু গিলে ফেলে। যাদুকররা বুঝে যায়—এটা জাদু নয়, এটা সত্য। তারা তখনই সিজদায় লুটিয়ে পড়ে।

🧠 শিক্ষা:
সত্যের সামনে মিথ্যা যত বড়ই হোক, তার মাথা নোয়াতেই হয়।

2️⃣ দুর্ভিক্ষের আযাব

📖 আয়াত:

﴿وَلَقَدْ أَخَذْنَآ ءَالَ فِرْعَوْنَ بِٱلسِّنِينَ وَنَقْصٍۢ مِّنَ ٱلثَّمَرَٰتِ﴾
“আমি ফেরাউনের জাতিকে দুর্ভিক্ষ ও ফল-ফসলের ঘাটতি দিয়ে শাস্তি দিয়েছিলাম।”
— সূরা আল আ‘রাফ, আয়াত ১৩০

📜 ঘটনা:
হযরত মূসা (আ.) সতর্ক করে বলেন, তারা যদি আল্লাহর পথে না ফিরে, তবে আকাশ বন্ধ হবে, বৃষ্টি হবে না, জমিন শুকিয়ে যাবে। ঠিক তাই-ই হয়। বছর বছর দুর্ভিক্ষ, খাদ্য সংকট, খাদ্যশস্যের দাম বাড়ে। তবু তারা শিক্ষা নেয় না।

🧠 শিক্ষা:
যখন আমরা কৃতজ্ঞতা হারাই, তখন আল্লাহ আমাদের নেয়ামত ফিরিয়ে নেন।

3️⃣ প্রাকৃতিক দুর্যোগ – ঝড়, বজ্রপাত, শিলা-বৃষ্টি

📖 আয়াত:

﴿فَأَرْسَلْنَا عَلَيْهِمُ ٱلطُّوفَانَ﴾
“আমি তাদের ওপর পাঠালাম প্রবল তুফান।”
— সূরা আল-আ‘রাফ, আয়াত ১৩৩

📜 ঘটনা:
হঠাৎ আকাশ কালো করে আসে। মেঘ থেকে গর্জন, বজ্রপাত, শিলা বৃষ্টি, তীব্র বাতাস—সবকিছু এমনভাবে নামে যে মাঠের ফসল, গবাদিপশু, ঘরবাড়ি সব ধ্বংস হয়। তারা তখন বলে, “মূসা! তোমার প্রভুর কাছে দোয়া করো, আমরা আর এমন করব না!”

🧠 শিক্ষা:
অন্যায়কারীরা যখন ভোগে, তারা তখনই আল্লাহকে ডাকে—কিন্তু বিপদ কেটে গেলে আবার পুরনো খেলায় ফেরে।

4️⃣ পঙ্গপালের ভয়াবহ আক্রমণ

📖 আয়াত:

﴿وَٱلْجَرَادَ﴾
“...এবং পঙ্গপাল।”
— সূরা আল-আ‘রাফ, আয়াত ১৩৩

📜 ঘটনা:
আকাশ কালো করে আসে কোটি কোটি পঙ্গপাল। তারা শুধু সবুজ দেখলেই খায়—ফসল, পাতা, গাছ, এমনকি কাঠের জানালাও ছাড়ে না। শস্য-ভাণ্ডার ধ্বংস। ফেরাউন আবার বলে, “মূসা, আল্লাহর কাছে দোয়া করো, আর হবে না!”

🧠 শিক্ষা:
একটা কীটের বাহিনীই পুরো সভ্যতা ধ্বংস করে দিতে পারে, যদি আল্লাহ আদেশ করেন।

5️⃣ উকুন ও কীটপতঙ্গের আযাব

📖 আয়াত:

﴿وَٱلْقُمَّلَ﴾
“...এবং উকুন।”
— সূরা আল-আ‘রাফ, আয়াত ১৩৩

📜 ঘটনা:
সারা মিশরে এমনভাবে উকুন ছড়িয়ে পড়ে যে, মানুষের মাথা, দাড়ি, পশুদের গায়ে, বিছানা, খাবার—সবকিছু দখল করে নেয়। গুদামে রাখা খাদ্যও পচে যায়। প্রচণ্ড অস্বস্তিতে তারা কাতর হয়ে আবার মূসার দ্বারস্থ হয়।

🧠 শিক্ষা:
যে জাতি নাফরমান, আল্লাহ তাদের শান্তি কেড়ে নেন ঘরের ভিতর থেকেই।

6️⃣ ব্যাঙের সয়লাব

📖 আয়াত:

﴿وَٱلضَّفَادِعَ﴾
“...এবং ব্যাঙ।”
— সূরা আল-আ‘রাফ, আয়াত ১৩৩

📜 ঘটনা:
রান্নার হাঁড়ি, বিছানা, জুতা, মাথার উপর, শৌচাগার—সব জায়গায় ব্যাঙ। রাতে ঘুম নেই, দিনে কাজ নেই। ব্যাঙের চ্যাঁচামেচিতে জনজীবন অচল। এই আজাবেও তারা মূসার কাছে দোয়া চায়।

🧠 শিক্ষা:
আল্লাহর সৈনিকদের কোনো অস্ত্র লাগে না—একটা ব্যাঙ দিয়েও তিনি শিক্ষা দেন।

7️⃣ রক্তের আযাব

📖 আয়াত:

﴿وَٱلدَّمَ﴾
“...এবং রক্ত।”
— সূরা আল-আ‘রাফ, আয়াত ১৩৩

📜 ঘটনা:
পানির কূপ, নদী, ঝরনা—সবকিছু রক্তে পরিণত হয়। মাছ মরে যায়, পানির দুর্গন্ধে কেউ কিছু খেতে পারে না। বনী ইসরাঈলদের পানি থাকে স্বাভাবিক, কিন্তু মিশরীয়রা দেখলেই রক্ত! এক সপ্তাহ এভাবে কষ্ট পেয়ে তারা আবার মূসার কাছে দোয়া চায়।

🧠 শিক্ষা:
আল্লাহ যদি চান, পানি জীবন না হয়ে মৃত্যু হয়ে দাঁড়ায়।

🧾 শেষ আয়াত দিয়ে বার্তা:

﴿فَٱنظُرْ كَيْفَ كَانَ عَـٰقِبَةُ ٱلْمُفْسِدِينَ﴾
“দেখো, ফাসাদকারীদের পরিণতি কী ভয়াবহ হয়েছিল।”
— সূরা আল আ‘রাফ, আয়াত ১০৩

✅ উপসংহার (Reality Check):

এগুলো নিছক কাহিনী না, বরং আমাদের জন্য এক আয়নাও বটে। আজও যখন সমাজ অন্যায়, জুলুম ও গাফেলতায় ডুবে যায়, তখন আল্লাহর আজাব নেমে আসে—শুধু রঙটা বদলায়, পদ্ধতি বদলায়। কিন্তু শিক্ষা, তা কখনো পুরাতন হয় না।



কোন মন্তব্য নেই

luoman থেকে নেওয়া থিমের ছবিগুলি. Blogger দ্বারা পরিচালিত.