কোরআন শিক্ষার গুরুত্ব ও ফজিলত সম্পর্কিত হাদিসসমূহ।
কোরআন শিক্ষার গুরুত্ব ও
ফজিলত সম্পর্কিত হাদিসসমূহ।
ভূমিকা:
মহাগ্রন্থ আল-কুরআন মানবজাতির হেদায়েতের একমাত্র পথপ্রদর্শক এবং মহান আল্লাহর পক্ষ থেকে এক বিশেষ নেয়ামত। মানবজীবনের সর্বক্ষেত্রে কোরআনের শিক্ষা ও এর সান্নিধ্য অর্জন করা অত্যন্ত জরুরি। একজন মুমিনের জীবনের সার্থকতা নির্ভর করে কোরআন শিক্ষা, তার বিশুদ্ধ তিলাওয়াত এবং বাস্তব জীবনে এর সঠিক আমল বা প্রয়োগের ওপর। রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বিভিন্ন হাদিসে কোরআন শিক্ষা ও এর ধারক-বাহকদের সুউচ্চ মর্যাদা ও ফজিলত বর্ণনা করেছেন। নিম্নে কোরআন শিক্ষার গুরুত্ব ও ফজিলত সম্পর্কিত অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কিছু হাদিস তুলে ধরা হলো।
১. সর্বোত্তম হওয়ার মাধ্যম:
হাদিস: উসমান ইবনে আফফান (রাঃ) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বলেছেন: خَيْرُكُمْ مَنْ تَعَلَّمَ الْقُرْآنَ وَعَلَّمَهُ
অর্থ: তোমাদের মধ্যে সর্বোত্তম ব্যক্তি সেই, যে কোরআন শিক্ষা করে এবং তা (অন্যকে) শিক্ষা দেয়।
(বুখারী ৫০২৭; তিরমিযী ২৯০৭; আবু দাউদ ১৪৫২)
ব্যাখ্যা: এই হাদিসটি কোরআন শিক্ষা ও শিক্ষাদানের শ্রেষ্ঠত্বকে সুস্পষ্টভাবে তুলে ধরেছে। যে ব্যক্তি নিজে কোরআন শেখে এবং অন্যদের শেখায়, সে আল্লাহর কাছে সর্বোত্তমদের অন্তর্ভুক্ত হয়।
২. দ্বিগুণ সওয়াব ও ফেরেশতাদের সান্নিধ্য:
হাদিস: আয়েশা (রাঃ) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বলেছেন:
الْمَاهِرُ بِالْقُرْآنِ مَعَ السَّفَرَةِ الْكِرَامِ الْبَرَرَةِ، وَالَّذِي يَقْرَأُ الْقُرْآنَ وَيَتَتَعْتَعُ فِيهِ وَهُوة عَلَيْهِ شَاقٌّ لَهُ أَجْرَانِ
অর্থ: কোরআন পাঠে দক্ষ ব্যক্তি সম্মানিত লিপিকার (ফেরেশতা)-গণের সাথে থাকবে। আর যে ব্যক্তি কোরআন পাঠ করে এবং সে তাতে আটকে যায় ও কষ্ট করে পড়ে, তার জন্য দুটি প্রতিদান রয়েছে।(বুখারী ৪৯৩৭;মুসলিম ৭৯৮)
ব্যাখ্যা: এই হাদিসটি কোরআন পাঠকারীদের দুটি শ্রেণীর ফজিলত বর্ণনা করে। যারা কোরআন পাঠে দক্ষ, তারা ফেরেশতাদের মতো উচ্চ মর্যাদার অধিকারী হবেন। আর যারা কষ্ট করে হলেও কোরআন পাঠ করার চেষ্টা করে, তারাও দ্বিগুণ সওয়াব পাবে—একটি পাঠের জন্য এবং অন্যটি কষ্টের জন্য। এটি শিক্ষানবিশদের জন্য বিরাট অনুপ্রেরণা।
৩.কিয়ামতের দিন সুপারিশকারী:
হাদিস: আবু উমামা আল-বাহিলী (রাঃ) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বলেছেন:
اقْرَءُوا الْقُرْآنَ فَإِنَّهُ يَأْتِي يَوْمَ الْقِيَامَةِ شَفِيعًا لِأَصْحَابِهِ
অর্থ: তোমরা কোরআন পাঠ করো। কারণ কিয়ামতের দিন তা তার পাঠকদের জন্য সুপারিশকারী হয়ে আসবে।
(সহীহ মুসলিম, হাদিস নং ৮০৪)
ব্যাখ্যা: এই হাদিসটি কোরআনের একটি বিরাট ফজিলত তুলে ধরে যে, কোরআন কিয়ামতের কঠিন দিনে তার পাঠকারীদের জন্য সুপারিশ করবে এবং তাদের মুক্তি লাভের কারণ হবে।
৪. ঈমানদার ও কুরআনের উপমা:
হাদিস: আবু মূসা আল-আশ'আরী (রাঃ) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বলেছেন:
যে ব্যক্তি কোরআন পাঠ করে এবং তদনুযায়ী আমল করে, তার উদাহরণ হলো লেবুর মতো—তার সুগন্ধও ভালো এবং তার স্বাদও ভালো। আর যে ব্যক্তি কোরআন পাঠ করে না, কিন্তু তদনুযায়ী আমল করে, তার উদাহরণ হলো খেজুরের মতো—তার কোনো সুগন্ধ নেই, কিন্তু তার স্বাদ মিষ্টি। আর যে ব্যক্তি কোরআন পাঠ করে, কিন্তু তদনুযায়ী আমল করে না, তার উদাহরণ হলো সুরুল গাছের মতো—তার সুগন্ধ ভালো, কিন্তু তার স্বাদ তিক্ত। আর যে ব্যক্তি কোরআন পাঠ করে না এবং তদনুযায়ী আমলও করে না, তার উদাহরণ হলো মাকাল ফলের মতো—তার কোনো সুগন্ধ নেই এবং তার স্বাদও তিক্ত।(বুখারী ৫৪২৭; মুসলিম ৭৯৭)
ব্যাখ্যা: এই হাদিসটি কোরআন পাঠ এবং আমলের গুরুত্বকে চমৎকার উপমার মাধ্যমে ফুটিয়ে তুলেছে। এটি নির্দেশ করে যে, শুধু পাঠ করা নয়, বরং কোরআনের নির্দেশ অনুযায়ী জীবনযাপন করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
৫. জান্নাতে উচ্চ মর্যাদা লাভ:
হাদিস: আবদুল্লাহ ইবনে আমর (রাঃ) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বলেছেন:
يُقَالُ لِصَاحِبِ الْقُرْآنِ: اقْرَأْ وَارْتَقِ وَرَتِّلْ كَمَا كُنْتَ تُرَتِّلُ فِي الدُّنْيَا، فَإِنَّ مَنْزِلَتَكَ عِنْدَ آخِرِ آيَةٍ تَقْرَؤُهَا
অর্থ: কিয়ামতের দিন কোরআনের ধারককে বলা হবে: 'পড়তে থাকো এবং উপরে উঠতে থাকো, আর তারতীল (ধীরস্থির ও সুন্দরভাবে) সহকারে পাঠ করো, যেমন দুনিয়াতে তারতীল সহকারে পাঠ করতে। কারণ তোমার স্থান হবে সেই আয়াতের শেষে, যা তুমি পাঠ করবে।(তিরমিযী ২৯১৪; আবু দাউদ ১৪৬৪)
ব্যাখ্যা: এই হাদিসটি হাফেজে কোরআন বা কোরআনের ধারকদের জন্য বিরাট সুসংবাদ। এর মাধ্যমে বোঝা যায় যে, জান্নাতে তাদের মর্যাদা তাদের মুখস্থকৃত আয়াত সংখ্যার উপর নির্ভর করবে।
৬.আল্লাহর রহমত ও শান্তি লাভ:
হাদিস: আবু হুরায়রা (রাঃ) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বলেছেন:
وَمَا اجْتَمَعَ قَوْمٌ فِي بَيْتٍ مِنْ بُيُوتِ اللَّهِ يَتْلُونَ كِتَابَ اللَّهِ وَيَتَدَارَسُونَهُ بَيْنَهُمْ إِلَّا نَزَلَتْ عَلَيْهِمُ السَّكِينَةُ وَغَشِيَتْهُمُ الرَّحْمَةُ وَחَفَّتْهُمُ الْمَلَائِكَةُ وَذَكَرَهُمُ اللَّهُ فِيمَنْ عِنْدَهُ
অর্থ: যখনই কোনো সম্প্রদায় আল্লাহর ঘরসমূহের কোনো ঘরে একত্রিত হয়, আল্লাহর কিতাব তিলাওয়াত করে এবং তা পরস্পর অধ্যয়ন করে, তখন তাদের উপর শান্তি বর্ষিত হয়, রহমত তাদের ঢেকে ফেলে, ফেরেশতারা তাদের ঘিরে রাখে এবং আল্লাহ তাদের কথা তার নিকটবর্তী ফেরেশতাদের কাছে উল্লেখ করেন।
(মুসলিম ২৬৯৯; আবু দাউদ, ১৪৫৫)
ব্যাখ্যা: এই হাদিসটি জামাআতে কোরআন শিক্ষা ও অধ্যয়নের বিরাট ফজিলত বর্ণনা করে। এর মাধ্যমে আল্লাহর রহমত, ফেরেশতাদের সান্নিধ্য এবং আল্লাহর পক্ষ থেকে বিশেষ সম্মান লাভ হয়।
৭. পিতামাতার জন্য নূরের তাজ:
হাদিস: বুরাইদা (রাঃ) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বলেছেন:
যে ব্যক্তি কোরআন পাঠ করে, তা শিখে এবং সে অনুযায়ী আমল করে, কিয়ামতের দিন তার পিতামাতাকে নূরের এমন একটি তাজ পরানো হবে, যার আলো সূর্যের আলোর মতো হবে। এবং তাদের দুজনকে এমন দুটি পোশাক পরানো হবে, যার মূল্য দুনিয়ার সবকিছুর চেয়ে বেশি। তখন তারা বলবে: 'এগুলো আমাদের কেন পরানো হলো?' উত্তরে বলা হবে: 'তোমাদের সন্তান কোরআন শিক্ষা গ্রহণ করার কারণে'।
(আবু দাউদ ১৪৫৩; আহমাদ ২২৯৩৫)
ব্যাখ্যা: এই হাদিসটি কোরআন শিক্ষার এক অনন্য ফজিলত বর্ণনা করে যে, এর সওয়াব শুধু ব্যক্তি নিজে নয়, বরং তার পিতামাতাও লাভ করেন এবং কিয়ামতের দিন সম্মানিত হন।
উপসংহার:
পরিশেষে বলা যায়, উপরোক্ত হাদিসসমূহ থেকে এটি স্পষ্ট যে, কোরআন মাজীদ কেবল পড়ার জন্য নয়, বরং এটি শিক্ষা করা, অন্যকে শেখানো এবং সেই অনুযায়ী জীবন পরিচালনা করার মধ্যেই রয়েছে প্রকৃত সফলতা। কোরআনের এই নুর যেমন দুনিয়াতে মানুষের অন্তরকে প্রশান্ত করে, তেমনি পরকালেও এটি মুক্তি ও উচ্চ মর্যাদা লাভের সোপান হয়ে দাঁড়াবে। আল্লাহ তাআলা আমাদের সকলকে সহীহভাবে কোরআন শিক্ষা করার এবং এর আলোয় জীবনকে আলোকিত করার তাওফিক দান করুন। আমীন।


কোন মন্তব্য নেই