শ্রেষ্ঠ মানুষেরা -আদম (আঃ) [পর্ব- 2]

 

 ইবলীসের অহংকার বনাম আদম (আঃ)-এর শ্রেষ্ঠত্ব: একটি আধ্যাত্মিক বিশ্লেষণ। 


গত পর্বের প্রশ্নের উত্তরঃ

প্রথম পর্বের শেষে আমরা দুটি প্রশ্ন রেখেছিলাম। 

প্রথমত, ইবলিসের হাজার বছরের ইবাদত কেন কবুল হলো না? এর কারণ হলো—তার ইবাদত ছিল শর্তসাপেক্ষ, লোকদেখানো এবং  শ্রেষ্ঠত্ব অর্জনের জন্য, আল্লাহর নিঃস্বার্থ ভালোবাসার জন্য নয়। 


দ্বিতীয়ত, মাটি অপেক্ষা আগুন বা নূর শক্তিশালী হওয়া সত্ত্বেও আদম (আ.) কেন শ্রেষ্ঠ? 

এর উত্তর হলো 'জ্ঞান'। আল্লাহ আদম (আ.)-কে যে বিশেষ জ্ঞান ও প্রজ্ঞা দান করেছিলেন, তা অন্য কোনো সৃষ্টির ছিল না। এই জ্ঞানই তাঁকে সবার ঊর্ধ্বে আসীন করেছে।



ইবলীসের ইবাদত ও গোপন উদ্দেশ্যঃ

ইবলীস যখন বছরের পর বছর আল্লাহর ইবাদত করার পর ইবাদতকারীদের মধ্যে অত্যন্ত সম্মানিত অবস্থানে পৌঁছে যায়, যখন সে আল্লাহর এমন নৈকট্য লাভ করার সুযোগ পায়, যা শুধুমাত্র বিশেষ কিছু ফেরেশতারাই পেয়েছিল, তখন আল্লাহ তাকে আরও একটি বিশেষ ইবাদত করার সুযোগ করে দিয়েছিলেন। 


তাকে বলেছিলেন আদম আলাইহিস্সালাম কে সিজদা করতে। কিন্তু সে আল্লাহর আদেশ অমান্য করল। আল্লাহর আদেশ অমান্য করার মাধ্যমে তার এত বছরের ইবাদতের একটি দিক প্রকাশ পেল। তার এত বছরের ইবাদত জুরেই ছিল আরো মর্যাদা পাওয়ার আকাঙ্ক্ষা, নিজের মাহাত্ম্য প্রমাণের আকাঙ্ক্ষা।


আল্লাহ যেহেতু (লতিফুল খবির) , প্রতিটি অন্তরের সবচেয়ে গোপন বিষয়গুলো সম্পর্কেও অবগত। তাই তিনি সবসময়ই জানতেন ইবলীসের ইবাদতের গভীরে কেমন উদ্দেশ্য লুকিয়ে রয়েছে। কিন্তু তিনি তো আর-হামুর রহিমীন। 


তাই তিনি ইবলীসকে ধীরে ধীরে তার কাছে টেনে নিয়েছেন। তাকে শ্রেষ্ঠতর সঙ্গীদের সাথে তার রবের ইবাদত করার সুযোগ করে দিয়েছেন। কিন্তু তার অন্তরের অহংবোধ এত প্রবল ছিল, যে সৃষ্টির সেরা ইবাদতকারীদের সঙ্গ পেয়েও তার মধ্যে কোনো পরিবর্তন আসেনি। 




অতঃপর আল্লাহ তার সামনে এমন এক পরীক্ষা দিলেন, যা থেকে পরিষ্কার হয়ে গেল, তার অন্তরে আসলে কী ছিল। 


যে সত্যিকার অর্থে আল্লাহকে ভালোবেসেছে, একনিষ্ঠভাবে তাঁরই নৈকট্য লাভ করার জন্যে ইবাদত করেছে, সে আল্লাহর হুকুম মানার জন্য উৎসুক হয়ে থাকবে। আল্লাহ তাকে যে হুকুমই দেন না কেন। 


ইবলীস যখন আল্লাহর আদেশ অমান্য করল তখন সবার কাছেই এ ব্যাপারটা পরিষ্কার হয়ে গেল, তার অন্তরে আল্লাহর আনুগত্যের চেয়ে নিজের পদমর্যাদা প্রাধান্য পেয়েছে। 

এবং সে এতটাই হতভাগা, যে সে যেই পদমর্যাদার কামনায় নিজেকে ধ্বংসের দিকে ঠেলে দিল, সেই পদমর্যাদা একনিষ্ঠভাবে আল্লাহর আনুগত্য করলে এমনিই তার হয়ে যেত। এদিকে, হাজার হাজার বছর পর আজও কত মানুষ সেই একই ধোঁকার মধ্যে পড়ে রয়েছে। 





আনুগত্যের পরীক্ষা ও জ্ঞানের মর্যাদাঃ


সামান্য মাটির তৈরি আদম আলাইহিস্সালাম কে আল্লাহ নূরের তৈরি ফেরেশতা ও আগুনের তৈরি জিনদের সিজদা করতে বললেন কেন?

এর বিভিন্ন কারণের মধ্যে একটি হচ্ছে জ্ঞানের মর্যাদা। আল্লাহ আদম আলাইহিস্সালাম কে সৃষ্টি করার সাথে সাথেই তাকে সিজদা করার হুকুম দেননি। 


বরং তিনি প্রথমে তাকে শিক্ষা দিয়েছিলেন এবং আদম আলাইহিস্সালাম সেই শিক্ষা গ্রহণ করার পরই বাকিদের কাছ থেকে সিজদা করার মতো অবস্থানে পৌঁছেছেন। 



আল্লাহর রহমতে আদম আলাইহিস্সালাম জান্নাতে বাস করতে লাগলেন। ইবলীস নিজেকে ধ্বংসের দিকে ঠেলে দিয়ে ওত পেতে বসে থাকলো আদম আলাইহিস্সালাম কেও ফাঁদে ফেলার জন্য। 


জান্নাতে নিঃসঙ্গতা ও মা হাওয়া (আঃ)-এর সৃষ্টিঃ

অন্যদিকে, আদম আলাইহিস্সালাম জান্নাতের অগণিত নেয়ামত উপভোগ করতে লাগলেন। কিন্তু বছরের পর বছর পার হয়ে যাওয়ার পর তিনি তার অন্তরে এক নতুন ধরনের অনুভূতি আবিষ্কার করলেন। 

এই অনুভূতি ছিল একাকীত্ববোধ তিনি ধীরে ধীরে লক্ষ্য করলেন, আল্লাহর জগতে এত এত ফেরেশতা, এত এত জান্নাতি পশু পাখি, কিন্তু তার মতো আর কেউ নেই। 


অতঃপর আল্লাহ তার জন্য একজন জীবনসঙ্গী সৃষ্টি করলেন আমাদের মা হাওয়া আলাইহিস্সালামের জন্ম হল। তাকে পাওয়ার সাথে সাথে আদম আলাইহিস সালামের নিঃসঙ্গতা দূর হয়ে গেল। আল্লাহ বললেন-

وَمِنْ آيَاتِهِ أَنْ خَلَقَ لَكُمْ مِنْ أَنْفُسِكُمْ أَزْوَاجًا لِّتَسْتُقْنُوا إِلَيْهَا وَجَعَلَ بَيْنَكُمْ مَوَدَّةً وَرَحْمَةً ۗ إِنَّ فِي ذَٰلِكَ لَآيَاتٍ لِّقَوْمٍ يَتَفَكَّرُونَ


আর তাঁর নিদর্শনাবলীর মধ্যে রয়েছে, তিনি তোমাদের জন্য তোমাদেরই জাতি থেকে সৃষ্টি করেছেন স্ত্রীগণকে, যাতে তোমরা তাদের কাছে প্রশান্তি লাভ করো  এবং তোমাদের মধ্যে ভালোবাসা ও দয়া সৃষ্টি করেছেন।  অবশ্যই এর মধ্যে বহু নিদর্শন রয়েছে তাদের জন্য যারা চিন্তা-ভাবনা করে।(সুরা রুম ২১)


আদম আলাইহিস সালাম ও হাওয়া আলাইহিস সালামের জন্য আল্লাহ পুরো জান্নাত উন্মুক্ত করে দিলেন। শুধুমাত্র একটি গাছের ব্যাপারে তাদের সতর্ক করে দিলেন। বললেন, এই গাছের কাছেও এসো না। 

এই আদেশকে ঘিরেই ইবলীস তার ফাঁদ বাঁধতে লাগল। 

সে ধাপে ধাপে আদম আলাইহিস সালাম কে বিভ্রান্ত করার চেষ্টা করতে লাগলো। অবশেষে সে আল্লাহর কসম খেয়ে বলল, সে তাদের সদুপদেশ দিচ্ছে যে, তারা যদি সেই গাছের ফল খায়, তারা অমর হয়ে যাবেন, ফেরেশতাদের মতো হয়ে যাবেন। 

আদম আলাইহিস সালাম এবং মা হাওয়া এত পবিত্র পরিবেশে জীবনযাপন করেছিলেন যে, তারা কখনো মিথ্যা কথার সম্মুখীনই হননি। আল্লাহর কসম খেয়ে মিথ্যা কথা বলা তো অনেক দূরের কথা। 


তারা ইবলীসের ফাঁদে পা দিলেন এবং সেই নিষিদ্ধ গাছের ফল খেয়ে ফেললেন। আর সাথে সাথেই তারা তাদের নগ্নতা উপলব্ধি করলেন । যে আলো দ্বারা তাদের নগ্নতা সুরক্ষিত ছিল সেই আলো নিভে গেল। তারা গাছ পাতা দিয়ে নিজেদের ঢেকে নিলেন। 

আদম আলাইহিস সালাম ও মা হাওয়া সাথে সাথে তাদের ভুল বুঝতে পারলেন। যদিও ইবলীস তাদেরকে ফাঁসিয়ে ছিল, তারা বুঝতে পারলেন, যখন আল্লাহ পরিষ্কার আদেশ করেছিলেন তাদেরকে সেই গাছ থেকে ফল না খাওয়ার জন্য, তখন তাদের ইবলীসের কথায় কান দেয়া উচিত হয়নি। 

তাই এতে তাদেরও দোষ ছিল।অতপর, তারা আল্লাহর কাছে দোয়া করে বললেন,

 "رَبَّنَا ظَلَمْنَا أَنْفُسَنَا وَإِنْ لَمْ تَغْفِرْ لَنَا وَتَرْحَمْنَا لَنَكُونَنَّ مِنَ الْخَاسِرِينَ"

 হে আমাদের রব, আমরা আমাদের নফসের উপর জুলুম করেছি, এবং যদি আমাদেরকে আপনি ক্ষমা না করেন এবং আমাদের উপর রহম না করেন, তবে নিশ্চয়ই আমরা ক্ষতিগ্রস্তদের অন্তর্ভুক্ত হব। (সুরা আরাফ ২৩) 

 

আর এখানেই আদম আলাইহিস সালাম ও ইবলীসের মধ্যে একটি স্পষ্ট পার্থক্য দেখা যায়। যখন ইবলীস আল্লাহর সরাসরি আদেশ অমান্য করেছিল, সে আল্লাহকেই দোষারোপ করেছিল "নাউযুবিল্লাহ" সে বলেছিল, "নিশ্চয়ই আপনিই আমাকে পথভ্রষ্ট করেছেন, অতএব আমি মানুষকে পথভ্রষ্ট করব।"


তওবা ও পৃথিবীতে আগমন

অন্যদিকে, আদম আলাইহিস সালাম নিজের ভুলের দায়ভার পুরোপুরি নিজের কাঁধে নিয়ে আল্লাহর কাছে নিজেকে সঁপে দিয়ে বলেছেন, "আল্লাহ যদি তাকে ক্ষমা না করেন, তাঁর আর কোনো আশা থাকবে না। তাঁর আর কোনো উপায় থাকবে না"। অতপর,আল্লাহ আদম আলাইহিস সালাম ও মা হাওয়ার দোয়া  কবুল করলেন।


কিন্তু তাদেরকে এও আদেশ করলেন, যেহেতু তারা সেই গাছের ফল খেয়েছিল, তাই তাদেরকে একটা নির্দিষ্ট সময়ে পৃথিবীতে কাটাতে হবে। 

মুসলিম শরীফের হাদিসে এসেছে, সাহাবী আবু হুরাইরা (রাঃ) থেকে। সেখানে রাসূল ﷺ বলেছেন:

“সর্বোত্তম দিন যেদিন সূর্য উদিত হয় তা হলো শুক্রবার। এই দিনে আদম (আঃ) কে সৃষ্টি করা হয়েছে, এই দিনেই তাকে জান্নাতে প্রবেশ করানো হয়েছে, এবং এই দিনেই তাকে সেখান থেকে বের করা হয়েছে। (সহীহ মুসলিম ৮৫৪ ) 



আদম আলাইহিস সালাম আর মা হাউয়া পৃথিবীর দুটি আলাদা স্থানে অবতীর্ণ হলেন। তারা ঠিক কোথায় অবতীর্ণ হয়েছিলেন সে বিষয়ে বিভিন্ন মত রয়েছে। তবে সব বর্ণনায় যা আসে তা হল তারা দুজন পৃথক পৃথক জায়গায় অবতীর্ণ হয়েছিলেন।  


জান্নাতের মতো জায়গায় একে অপরের মধুর সঙ্গ পাওয়ার পর দুনিয়ার মতো জায়গায় এসে নিঃসঙ্গ দিন কাটানো অনেক বড় একটা পরীক্ষা ছিল। 



একবার ভেবে দেখুন আপনার জীবনসঙ্গী যাকে আপনি সবসময়ই কাছে পাচ্ছেন, ঘরে ফিরলেই যার দেখা হয়, যাকে ঘিরে আপনার সব পরিকল্পনা। 

তাকে যদি হঠাৎ করে আপনি হারিয়ে ফেলেন ঠিক কত দিনের জন্য আপনি হারিয়ে ফেলেছেন আপনি জানেন না। 

আপনি রবের কাছে দোয়া করছেন,কিন্ত আপনার ভয় হচ্ছে সেই রব আপনার উপর রেগে আছেনকিনা! আপনি এমন একটি জায়গায় আছেন যা অন্ধকার, যা ভয়ানক। 

এমনকি আপনি জানেনও না আপনার জীবনসঙ্গী কেমন আছে অথবা কোন জায়গায় আছে। এমন অবস্থায় নিজেকে কতটা অসহায় মনে হবে?  


তারা ব্যাকুল হয়ে একে অপরকে খুঁজতে লাগলেন। খুঁজতে খুঁজতে কত দিন পার হয়ে গেল তার কোনও নির্দিষ্ট হিসেব নেই।


কিন্তু অবশেষে তারা একে অপরকে খুঁজে পেলেন ।মা হাওয়া এবং আদম আলাইহিস সালাম তাদের দুনিয়ার জীবনের  সংসার শুরু করলেন। 


হাবীল-কাবীল ও প্রথম হত্যাকাণ্ড

বিভিন্ন বর্ণনায় এসেছে, আদম আলাইহিস সালাম দুনিয়াতে প্রায় এক হাজার বছর বেঁচেছিলেন। এবং এই সময়ে মা হাউয়া অনেকবার মা হয়েছিলেন । প্রতিবার তার কোলে আল্লাহর হুকুমে জমজ সন্তান জন্মগ্রহণ করেছিল। সেই সময়ের বিধান ছিল এক কোলের সন্তানকে আরেক কোলের সন্তানের সাথে বিয়ে করতে হবে। অর্থাৎ, যেহেতু তখন প্রতিটি মানুষই সরাসরি একে অপরের ভাইবোন ছিল, তখন ভাইবোনের মধ্যে বিয়ে করার নিষেধাজ্ঞা যমজ ভাইবোনদের মধ্যে সীমাবদ্ধ  ছিল। 


আদম আলাইহিসসালামের প্রথম পুত্র সন্তানের নাম ছিল কাবীল আর পরের পুত্র সন্তানের নাম ছিল হাবীল। কাবীল ছিল কৃষক এবং হাবীল পশুপাখি পালত। 

কাবীল ছিল কিছুটা রাগী প্রকৃতির এবং সে হাবীলের বোনকে বিয়ে করার ব্যাপারে অসম্মতি জানাল। তার দৃষ্টিতে তার নিজের বোন ছিল আরও বেশি রূপবতী। 


এ অবস্থায় আদম আলাইহিসসালামের মাধ্যমে ওহী আসল, তারা দুই ভাই যেন আল্লাহর উদ্দেশ্যে কোরবানী করে। 

অতপর,যার কোরবানী কবুল হবে তার পছন্দই চূড়ান্ত হবে। হাবীল তার খামার থেকে সবচেয়ে সুন্দর পশুটি আল্লাহর উদ্দেশ্যে কোরবানী করল। অন্যদিকে কাবীল তার সবচেয়ে খারাপ ফসলটি কোরবানীর নিয়তে উঠিয়ে রাখল। 


এদিকে আল্লাহ হাবীলের কোরবানী কবুল করলেন এবং কাবীলের কোরবানি কবুল হল না। হাবীল আল্লাহর হুকুম অনুযায়ী কাবীলের বোনকে বিয়ে করার জন্য সম্মতি জানাল। কিন্তু এতে কাবীলের অন্তর হিংসা বিদ্বেষে ভরে গেল। সে এক পর্যায়ে হাবীলকে বললো, সে হাবীলকে হত্যা করে ফেলবে। 



وَٱتْلُ عَلَيْهِمْ نَبَأَ ٱبْنَىْ ءَادَمَ بِٱلْحَقِّ إِذْ قَرَّبَا قُرْبَانًا فَتُقُبِّلَ مِنْ أَحَدِهِمَا وَلَمْ يُتَقَبَّلْ مِنَ ٱلْءَاخَرِ قَالَ لَأَقْتُلَنَّكَ قَالَ إِنَّمَا يَتَقَبَّلُ ٱللَّهُ مِنَ ٱلْمُتَّقِينَ

لَئِنۢ بَسَطتَ إِلَىَّ يَدَكَ لِتَقْتُلَنِى مَآ أَنَا۠ بِبَاسِطٍ يَدِىَ إِلَيْكَ لِأَقْتُلَكَ إِنِّىٓ أَخَافُ ٱللَّهَ رَبَّ ٱلْعَٰلَمِينَ

 

আর তাদেরকে আদমের দু’ছেলের সঠিক কাহিনী ও শুনিয়ে দাও। তারা দু’জন কুরবানী করলে তাদের একজনের কুরবানী কবুল করা হলো, অন্য জনেরটা কবুল করা হলো না। সে বললো, “আমি তোমাকে মেরে ফেলবো। সে জবাব দিল, আল্লাহ তো মুত্তাকিদের নজরানা কবুল করে থাকে।


তুমি আমাকে মেরে ফেলার জন্য হাত উঠালেও আমি তোমাকে মেরে ফেলার জন্য হাত উঠাবো না। আমি বিশ্ব জাহানের প্রভু আল্লাহকে ভয় করি। (সুরা মায়েদাহ ২৭-২৮) 


হাবীল তার ভাইকে বলল, "তুমি আমাকে হত্যা করার উদ্দেশ্যে হাত বাড়ালেও আমি তোমাকে হত্যা করার জন্য হাত বাড়াব না। কারণ আমি আল্লাহকে ভয় করি"

তার কথা শুনে কাবিল আরো ক্ষুব্ধ হয়ে উঠলো,  হাবিলকে হত্যা করার জন্য তার গলা চেপে ধরল কিন্তু তাকে হত্যা করতে পারলো না ।


তখন ইবলীস তাদের কাছে আসলো এবং হাবীলকে হত্যা করার পদ্ধতি শেখানোর জন্য একটি পশুর মাথায় পাথর দিয়ে পশুটিকে হত্যা করলো। 

সেটা দেখে, কাবীল একইভাবে একটি পাথর নিয়ে হাবীলের মাথায় আঘাত করলো। 

এভাবেই হাবীল হয়ে গেলো মানব ইতিহাসের প্রথম শহীদ। আর কাবীল হয়ে গেলো মানব ইতিহাসের প্রথম হত্যাকারী। 


যতক্ষণ পর্যন্ত আদম আলাইহিস্সালামের কাছে খবর এলো, ততক্ষণে কাবীল তার কর্মের পরিণামের কথা চিন্তা করে পালিয়ে গিয়েছে। সে ভাবলো, তার আর কোনো আশা নেই। আদম আলাইহিস্সালাম ও মা হাওয়া তাদের দুই সন্তানকে এভাবে হারিয়ে বুকে গভীর শোক ধারণ করে তাদের বাকি সন্তানদের সদুপদেশ দিতে থাকলেন।

এবং আল্লাহর ইবাদত করার জন্য উদ্বুদ্ধ করার চেষ্টা করতে থাকলেন। 


ধীরে ধীরে বহু বছর পার হয়ে গেল। এর মধ্যদিয়ে তাদের অনেক সন্তান জন্ম হল। কেউ কেউ বলেন মা হাওয়ার বিশ জোড়া যমজ সন্তান হয়েছিল। আবার কেউ কেউ বলেন যে, সেই সংখ্যা একশোরও বেশি এ ব্যাপারে নিশ্চিত হওয়ার কোনও উপায় নেই। 



শীষ (আ.) এর আগমনঃ 

তাদের সব সন্তান সন্ততিদের মধ্যে একজন সন্তান ছিলেন

 শীষ (আঃ) , যে তার বাবার মতো সমাজের মানুষকে ভালো কাজ করার উপদেশ দিতেন এবং খারাপ কাজ থেকে বিরত থাকার উপদেশ  দিতেন।


আদম আলাইহিস্সালাম যখন অনেক বৃদ্ধ, তখন একদিন তিনি ফল খাওয়ার ইচ্ছা প্রকাশ করলেন। বাস্তবে তার জান্নাতের ফলের কথা খুব মনে পড়ছিল তাই তিনি সেই ফলই খেতে চাচ্ছিলেন। 

কিন্তু তার সন্তানেরা যখন শুনল তাদের বাবা ফল খেতে চাচ্ছেন, তারা দ্রুত বেরিয়ে পড়লো সেই অঞ্চলের শ্রেষ্ঠ ফল নিয়ে আসার জন্য। 



আদম (আঃ) এর মৃত্যু ও শীষ (আঃ)   আগমনঃ  

আদম (আঃ) এর সন্তানেরা  যখন ফলের সন্ধানে জঙ্গলে গেল তখন সেখানে তাদের কিছু ফেরেশতাদের সাথে দেখা হয়। সেই ফেরেশতারা বললো, "তোমাদের বাবা যে ফল চেয়েছেন তা  এখানে নেই। তোমরা বরং তার কাছে ফিরে যাও এবং আমরাও তার সাথে সাক্ষাৎ করব। 

আদম আলাইহিস্সালামের সন্তানেরা যখন সেই ফেরেশতাদের নিয়ে বাড়ি ফিরল তখন মা হাওয়া সেই ফেরেশতাদের একজনকে চিনতে পারলো। কারণ সেই ফেরেশতা এর আগেও একবার দেখা দিয়েছিল,যখন তার ছেলে হাবিলকে হত্যা করা হয়েছিল।


তিনি বুঝতে পারলেন মালাকুল মউত তার স্বামীর আত্মাকে নিতে এসেছে। জান্নাতে বহুবছর সুখে শান্তিতে কাটানোর পর যখন তাদেরকে দুনিয়াতে পাঠানো হয়েছিল। 

তখন যে সময়টা মা হাওয়া আলাইহিস সালাম আদম আলাই সাল্লাম কে ছাড়া একা একা কাটিয়েছিলেন কষ্টকর সময়ের কথা তার মনে পড়ে গেল তাই তিনি মালাকুল মউতকে বাধা দিলেন। 


কিন্তু আদম আঃ মা হাওয়াকে বুঝিয়ে বললেন তাকে তার রবের কাছে ফিরে যেতে হবে। অবশেষে মা হাওয়া সরে দাঁড়ালেন এবংমালাকুল মাউত আদম আলাই সাল্লাম এর আত্মা নিয়ে নিলেন। 

তারা আদম আঃ এর মরা দেহকে গোসল করালেন, দাফন করলেন পরে মাটিতে কবর দিলেন। 

সেই প্রথা আমরা আজ পর্যন্ত চালিয়ে যাচ্ছি। আদম আলাইহি সাল্লাম এর মৃত্যুর সময় মানব সমাজ অনেকটাই বড় হয়ে গিয়েছিল। সেখানে ভালো কাজের পাশাপাশি নানা ধরনের পাপ কাজ বাড়তে লাগলো। 

এই অবস্থায় আল্লাহর বাণী প্রচার করার কাজের নামলেন আদম আলাই সালাম এর সন্তান শীষ আলাইহিস সালাম।

চলবে………. 


কোন মন্তব্য নেই

luoman থেকে নেওয়া থিমের ছবিগুলি. Blogger দ্বারা পরিচালিত.