নেতৃত্ব দান।
আজ আমরা আলোচনা করবো ইতিহাসের এক গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা এবং আল্লাহর ন্যায়পরায়ণ ব্যবস্থা সম্পর্কে। সূরা আল-কাসাসের চতুর্থ, পঞ্চম ও ষষ্ঠ আয়াত আমাদের জন্য বিশেষভাবে শিক্ষা পূর্ণ।
১. আল্লাহর কৌশল ও ক্ষমতা (تَدْبِيرُ اللَّهِ)
আল্লাহর ইচ্ছা সর্বব্যাপী এবং অপ্রতিরোধ্য। তিনি যখন কোনো কাজ করতে চান, তখন তার জন্য প্রয়োজনীয় কার্যকারণ ও উপায়-উপকরণ এমনভাবে তৈরি করেন যা মানুষের জ্ঞানের বাইরে। এর সবচেয়ে বড় উদাহরণ হলো মূসা (আ.)-এর প্রতিপালন। যে শিশুটির হাতে ফেরাউনের রাজত্বের পতন হওয়ার কথা ছিল, তাকে আল্লাহ স্বয়ং ফেরাউনের ঘরেই বড় হওয়ার ব্যবস্থা করে দিলেন। ফেরাউন তার সবচেয়ে বড় শত্রুকে নিজের হাতে লালন-পালন করছিল, অথচ সে তা জানতেও পারেনি। এটি প্রমাণ করে, আল্লাহর ইচ্ছার বিরুদ্ধে কেউ লড়াই করতে পারে না, এবং তাঁর কৌশলের মোকাবিলায় কোনো মানবীয় কৌশল সফল হতে পারে না।
২. নবুয়ত প্রাপ্তির পদ্ধতি (وَعْدُ اللَّهِ لِلْمُسْتَضْعَفِينَ)
নবুয়ত কোনো জমকালো বা জনসমক্ষে ঘোষিত বিষয় নয়। আপনারা অবাক হন যে, মুহাম্মাদ (সা.) কীভাবে গোপনে নবী হয়ে গেলেন। কিন্তু মূসা (আ.)-এর ঘটনাও ঠিক একই রকম। তিনি যখন পথে আগুন আনতে যাচ্ছিলেন, তখন সিনাই উপত্যকার এক নির্জন স্থানে হঠাৎ নবুয়ত লাভ করেন। এক মুহূর্ত আগেও তিনি জানতেন না যে তিনি পয়গম্বরী পেতে যাচ্ছেন। এটি প্রমাণ করে, আল্লাহ যখন কাউকে নবুয়ত দেন, তখন তা কোনো পূর্বঘোষণা ছাড়াই ঘটে থাকে।
৩. আল্লাহর সাহায্যকারী হিসেবে দল-বল নয়
আল্লাহ যখন কোনো বান্দার মাধ্যমে কোনো কাজ করাতে চান, তখন তার কোনো সেনাবাহিনী বা সাজ-সরঞ্জামের প্রয়োজন হয় না। বাহ্যিকভাবে সেই বান্দা হয়তো দুর্বল এবং নিঃসঙ্গ থাকে, কিন্তু তার মোকাবিলায় বড় বড় সেনাবাহিনী ও শক্তিশালী শাসকরা পরাজিত হয়। আপনারা আজ মুহাম্মাদ (সা.)-এর সাথে নিজেদের যে পার্থক্য দেখছেন, তার চেয়ে অনেক বেশি পার্থক্য ছিল মূসা (আ.) এবং ফেরাউনের শক্তির মধ্যে। কিন্তু ইতিহাস আমাদের দেখিয়ে দিয়েছে, শেষ পর্যন্ত কে জয়ী হয়েছে এবং কে পরাজিত হয়েছে। এটি প্রমাণ করে যে, প্রকৃত শক্তি দল-বলে নয়, বরং আল্লাহর ইচ্ছায় নিহিত।
সূরা আল-কাসাস, আয়াত ৪,৫,৬।
আয়াত ৪:
إِنَّ فِرْعَوْنَ عَلَا فِي الْأَرْضِ وَجَعَلَ أَهْلَهَا شِيَعًا يَسْتَضْعِفُ طَآئِفَةً مِّنْهُمْ يُذَبِّحُ أَبْنَآءَهُمْ وَيَسْتَحْيِۦ نِسَآءَهُمْ إِنَّهُۥ كَانَ مِنَ ٱلْمُفْسِدِينَ
বাংলা অর্থ: ফেরাউন পৃথিবীতে বিদ্রোহ করেছিল এবং তার অধিবাসীদেরকে বিভিন্ন দলে বিভক্ত করেছিল। তার নিপীড়িত দল থেকে ছেলেদের হত্যা করা হতো, মেয়েদের জীবিত রাখা হতো। আসলে সে বিপর্যয় সৃষ্টিকারীদের অন্তর্ভুক্ত ছিল।
এখানে “عَلَا فِي الْأَرْضِ” শব্দের অর্থ হলো—পৃথিবীতে মাথা তোলা। ফেরাউন তার আসল মর্যাদা থেকে উঠে স্বেচ্ছাচারী ও প্রভুর মতো আচরণ করতে শুরু করেছিল। অধীনদের ওপর জুলুম চালানো এবং স্বৈরাচারী হওয়া তার প্রধান বৈশিষ্ট্য ছিল।
ফেরাউনের শাসন ও নীতি:
অধিবাসীদেরকে জন্ম, বর্ণ, বংশ, ভাষা বা সামাজিক স্তরের ভিত্তিতে বিভিন্ন দলে ভাগ করা হত।
একদলকে বিশেষ সুযোগ-সুবিধা, ক্ষমতা ও মর্যাদা দেওয়া হতো।
অন্য দলকে অধীন, পর্যুদস্ত ও নিপীড়িত করা হতো।
নিম্নশ্রেণীর মানুষ কখনও শাসক দলে অন্তর্ভুক্ত হতে পারতো না।
মৌলিক মানবিক অধিকার, এমনকি জীবনধারণের অধিকারও ছিনিয়ে নেওয়া হতো।
আয়াত ৫-৬:
وَنُرِيدُ أَن نَّمُنَّ عَلَى ٱلَّذِينَ ٱسْتُضْعِفُوا۟ فِى ٱلْأَرْضِ وَنَجْعَلَهُمْ أَئِمَّةً وَنَجْعَلَهُمُ ٱلْوَٰرِثِينَ وَنُمَكِّنَ لَهُمْ فِى ٱلْأَرْضِ وَنُرِىَ فِرْعَوْنَ وَهَٰمَٰنَ وَجُنُودَهُمَا مِنْهُم مَّا كَانُوا۟ يَحْذَرُونَ
বাংলা অর্থ: আমি সংকল্প করেছিলাম, যাদেরকে পৃথিবীতে লাঞ্ছিত রাখা হয়েছিল তাদের প্রতি অনুগ্রহ করবো। তাদেরকে নেতৃত্ব দান করবো, তাদেরকেই উত্তরাধিকারী বানাবো, পৃথিবীতে তাদেরকে শক্তিশালী করে কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করবো। এবং তাদের চোখের সামনে ফেরাউন, হামান ও তাদের সৈন্যরা যা ভয় করত, তা ঘটবে।
ব্যাখ্যা:
আল্লাহ দুর্বলদেরকে নেতৃত্ব, উত্তরাধিকার ও পৃথিবীতে কর্তৃত্ব দান করবেন।
ফেরাউন এবং তার বাহিনী যা ভয় করত, তা তাদের চোখের সামনে ঘটবে।
এই আয়াত আমাদের শিক্ষা দেয়—যে অন্যায় ও জুলুম করে, তার রাজত্ব চিরস্থায়ী নয়। আল্লাহ দুর্বলদেরকে শক্তিশালী করে ন্যায় প্রতিষ্ঠা করেন।
অন্যান্য সূরার প্রাসঙ্গিক আয়াত
সূরা আল-আরাফ, আয়াত ১৩৭:
"আর যাদেরকে দুর্বল করা হয়েছিল, তাদেরকে আমি সেই যমীনের পূর্ব ও পশ্চিমের উত্তরাধিকারী করেছি, যাতে আমি বরকত দিয়েছি। আর ফিরআউন ও তার সম্প্রদায় যা নির্মাণ করত এবং যা তৈরি করত, তাতে তোমার রবের উত্তম বাণী পূর্ণ হয়ে গেছে। আর এটা এজন্য যে, তারা ধৈর্য ধারণ করেছিল।"
ব্যাখ্যা: এই আয়াতে ৫ নং আয়াতের প্রতিশ্রুতির পূর্ণতার একটি বর্ণনা রয়েছে। আল্লাহ বনি ইসরাইলকে ফেরাউনের শাসনের পর সিরিয়া ও ফিলিস্তিনের মতো বরকতময় ভূমির উত্তরাধিকারী করে দেন। এই আয়াতে আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় উল্লেখ করা হয়েছে: তাদের এই বিজয় ছিল তাদের ধৈর্যের (صبر) ফল। এটি প্রমাণ করে যে, নিপীড়িতদের মুক্তি শুধুমাত্র আল্লাহর ইচ্ছাতেই আসে না, বরং এর জন্য তাদের ধৈর্যের সাথে সংগ্রাম করাও অপরিহার্য।
সূরা ইব্রাহিম, আয়াত ১৩-১৪:
"(অতঃপর কাফেরদেরকে তাদের নবীগণ বললেন,) আমরা অবশ্যই তোমাদের দেশ থেকে বহিষ্কার করব, যদি না তোমরা আমাদের ধর্মাদর্শে ফিরে আস। তখন তাদের কাছে তাদের প্রতিপালক ওহী পাঠালেন যে, অবশ্যই আমি জালিমদেরকে ধ্বংস করব। এবং তাদের পর তোমাদেরকে পৃথিবীতে বসবাস করাব। এই বিধান তার জন্য, যে আমাকে ভয় করে এবং আমার ভয় দেখানোর ওয়াদাকে ভয় করে।"
ব্যাখ্যা: এই আয়াতগুলোতে একটি সাধারণ নীতি বর্ণনা করা হয়েছে: জালিম শাসকদের ধ্বংস এবং মজলুমদের মুক্তি। এটি একটি সার্বজনীন বার্তা যে, আল্লাহর এই প্রতিশ্রুতি শুধুমাত্র বনি ইসরাইলের জন্য নয়, বরং সকল যুগের সকল নিপীড়িতদের জন্য। যে কেউ আল্লাহর ওপর ভরসা করে এবং জালিমদের বিরুদ্ধে ধৈর্য ধরে, আল্লাহ তাকে সাহায্য করেন।
এই আয়াতগুলো আজকের যুগেও অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক। তারা মুসলিম উম্মাহকে এই বার্তা দেয় যে, জুলুমের মুখে হতাশ হওয়া উচিত নয়। বরং ধৈর্য (সবর) ও আল্লাহর প্রতি অবিচল আস্থা-র মাধ্যমে সংগ্রাম চালিয়ে যেতে হবে। আল্লাহর ন্যায়পরায়ণ ব্যবস্থা শেষ পর্যন্ত অবশ্যই প্রতিষ্ঠিত হবে।

কোন মন্তব্য নেই