ইসলামের প্রথম কিবলা কোনটি?

ইসলামের প্রথম কিবলা কোনটি? 

ইতিহাস ও প্রেক্ষাপট 

ভুমিকাঃ

ইসলামের ইতিহাসে 'কিবলা' কেবল একটি দিক নয়, বরং এটি মুসলিম উম্মাহর ঐক্য ও আনুগত্যের প্রতীক। মুসলিম হিসেবে আমাদের জানা প্রয়োজন কেন বায়তুল মুকাদ্দাসকে 'প্রথম কিবলা' বলা হয় এবং কীভাবে পবিত্র কাবার দিকে এটি পরিবর্তিত হলো। 


  • মসজিদুল আকসা নির্মাণের ইতিহাস

পৃথিবীর বুকে মসজিদুল হারামের পর দ্বিতীয় মসজিদ হলো মসজিদুল আকসা। সহিহ বুখারির একটি হাদিসে এর সুস্পষ্ট দলিল পাওয়া যায়:

হযরত আবু যার (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি বললাম, হে আল্লাহর রাসূল! পৃথিবীতে প্রথম কোন মসজিদ নির্মিত হয়েছে? তিনি বললেন, ‘মসজিদুল হারাম’। আমি পুনরায় জিজ্ঞাসা করলাম, তারপর কোনটি? তিনি বললেন, ‘মসজিদুল আকসা’। আমি জিজ্ঞাসা করলাম, উভয়ের মাঝে ব্যবধান কতটুকু ছিল? তিনি বললেন, ‘চল্লিশ বছর’।

(সহিহ বুখারি: ৩৩৬৬; সহিহ মুসলিম: ৫২০)


ইতিহাসবিদদের মতে, হযরত আদম (আ.) বা ফেরেশতাদের মাধ্যমে এর প্রাথমিক ভিত্তি স্থাপিত হয়। পরবর্তীতে হযরত ইয়াকুব (আ.) এর পুনর্নির্মাণ করেন এবং হযরত সুলাইমান (আ.) জিনের মাধ্যমে এর বিশাল অবকাঠামো নির্মাণ সম্পন্ন করেন।



  • প্রথম কিবলা হিসেবে মর্যাদা

নবীজি (সা.) নবুয়ত পাওয়ার পর থেকে মক্কায় থাকাকালীন বায়তুল মুকাদ্দাসের দিকে ফিরেই নামাজ পড়তেন। তবে তিনি এমনভাবে দাঁড়াতেন যেন কাবা এবং বায়তুল মুকাদ্দাস উভয়টিই তাঁর সামনে থাকে। কিন্তু মদিনায় হিজরতের পর সেটি সম্ভব ছিল না।


দলিল: হযরত বারা ইবনে আজেব (রা.) বর্ণনা করেন, "রাসূলুল্লাহ (সা.) বায়তুল মুকাদ্দাসের দিকে মুখ করে ১৬ বা ১৭ মাস নামাজ আদায় করেছেন।"

(সহিহ বুখারি: ৪০; সহিহ মুসলিম: ৫২৫)


  • কিবলা পরিবর্তন (তাহবিলে কিবলা)

মদিনায় হিজরতের প্রায় ১৭ মাস পর হিজরি দ্বিতীয় সালের মেজবান বা শাবান মাসে নামাজরত অবস্থায় কিবলা পরিবর্তনের ঐতিহাসিক নির্দেশ আসে।


কুরআনের দলিল: 

قَدْ نَرَىٰ تَقَلُّبَ وَجْهِكَ فِى ٱلسَّمَآءِ فَلَنُوَلِّيَنَّكَ قِبْلَةً تَرْضَىٰهَا فَوَلِّ وَجْهَكَ شَطْرَ ٱلْمَسْجِدِ ٱلْحَرَامِ وَحَيْثُ مَا كُنتُمْ فَوَلُّوا۟ وُجُوهَكُمْ شَطْرَهُۥ 


"নিশ্চয়ই আমি আপনার মুখ বারবার আকাশের দিকে উঠতে দেখছি। সুতরাং আমি আপনাকে এমন কিবলার দিকে ফিরিয়ে দেব যা আপনি পছন্দ করেন। এখন আপনি মসজিদুল  হারামের (কাবার) দিকে মুখ ফেরান।" 

(সূরা বাকারা, আয়াত: ১৪৪)


এই আয়াত নাজিল হওয়ার সময় নবীজি (সা.) জোহরের নামাজ (মতান্তরে আসর) পড়াচ্ছিলেন। মদিনার বনু সালেমা গোত্রের সেই মসজিদে তিনি নামাজরত অবস্থায় কাবার দিকে ঘুরে যান, যা আজ 'মাসজিদুল কিবলাতাইন' নামে পরিচিত।


  • তিন পবিত্র মসজিদের ফজিলত

ইসলামি শরিয়তে মসজিদুল আকসা সেই তিনটি মসজিদের একটি, যার উদ্দেশ্যে ইবাদতের নিয়তে সফর করা সওয়াবের কাজ।

রাসূল (সা.) এর ইরশাদ, "তিনটি মসজিদ ছাড়া অন্য কোনো স্থানে (সওয়াবের নিয়তে) সফর করো না— মসজিদুল হারাম, আমার এই মসজিদ (মসজিদে নববি) এবং মসজিদুল আকসা।"

(সহিহ বুখারি: ১১৮৯; সহিহ মুসলিম: ১৩৯৭)


  • নামাজের সওয়াবের তারতম্য

মসজিদুল আকসায় নামাজের সওয়াব সম্পর্কে বিভিন্ন বর্ণনা থাকলেও ইমামগণের মতে নির্ভরযোগ্য বর্ণনা হলো:


  • মসজিদুল হারাম: ১,০০,০০০ গুণ।

  • মসজিদে নববি: ১,০০০ গুণ।

  • মসজিদুল আকসা: ৫০০ গুণ (সুনানে ইবনে মাজাহ-এর বর্ণনায় ২৫,০০০ গুণের কথা উল্লেখ থাকলেও মুহাদ্দিসগণ ২৫০ বা ৫০০ গুণের বর্ণনাকে অধিক শক্তিশালী বলেছেন)।


উপসংহার

বায়তুল মুকাদ্দাস বা আল-কুদস কেবল ফিলিস্তিনিদের সম্পদ নয়, এটি প্রতিটি মুসলমানের ঈমানি ঐতিহ্যের অংশ। প্রথম কিবলা হিসেবে এর মর্যাদা এবং পবিত্রতা রক্ষা করা আমাদের ধর্মীয় দায়িত্ব।





কোন মন্তব্য নেই

luoman থেকে নেওয়া থিমের ছবিগুলি. Blogger দ্বারা পরিচালিত.