হজরতে মা আয়েশা সিদ্দিকা ( র.)/ইতিহাসের জঘন্যতম একটি অপবাদ।
হজরতে মা আয়েশা সিদ্দিকা ( র.)/ইতিহাসের জঘন্যতম একটি অপবাদ
اِنَّ الَّذِیْنَ جَآءُوْ بِالْاِفْكِ عُصْبَةٌ مِّنْكُمْؕ لَا تَحْسَبُوْهُ شَرًّا لَّكُمْؕ بَلْ هُوَ خَیْرٌ لَّكُمْؕ لِكُلِّ امْرِئٍ مِّنْهُمْ مَّا اكْتَسَبَ مِنَ الْاِثْمِۚ وَ الَّذِیْ تَوَلّٰى كِبْرَهٗ مِنْهُمْ لَهٗ عَذَابٌ عَظِیْمٌ
যারা এ মিথ্যা অপবাদ তৈরী করে এনেছে তারা তোমাদেরই ভিতরের একটি অংশ।এ ঘটনাকে নিজেদের পক্ষে খারাপ মনে করো না বরং এও তোমাদের জন্য ভালই।যে এর মধ্যে যতটা অংশ নিয়েছে সে ততটাই গোনাহ কামাই করেছে আর যে ব্যক্তি এর দায়-দায়িত্বের বড় অংশ নিজের মাথায় নিয়েছে তার জন্য তো রয়েছে মহাশাস্তি।
তাফসীর :
হযরত আয়েশার (রাঃ) বিরুদ্ধে যে অপবাদ রটানো হয়েছিল সেদিকে ইঙ্গিত করা হয়েছে। এ অপবাদকে “ইফ্ক” শব্দের মাধ্যমে উল্লেখ করে স্বয়ং আল্লাহর পক্ষ থেকেই এ অপরাধকে পুরোপুরি খণ্ডন করা হয়েছে।
‘ইফ্ক’ শব্দের অর্থ হচ্ছে, কথা উল্টে দেয়া, বাস্তব ঘটনাকে বিকৃত করে দেয়া। এ অর্থের দিক দিয়ে এ শব্দটিকে ডাহা মিথ্যা ও অপবাদ দেয়া অর্থে ব্যবহার করা হয়। আর কোন দোষারোপ অর্থে শব্দটি ব্যবহার করলে তখন এর অর্থ হয় সুস্পষ্ট মিথ্যা অপবাদ।
এ সূরাটি নাযিলের মূলে যে ঘটনাটি আসল কারণ হিসেবে কাজ করেছিল এখান থেকে তার ওপর আলোচনা শুরু হয়েছে।
ভূমিকায় এ সম্পর্কিত প্রারম্ভিক ঘটনা আমি হযরত আয়েশার বর্ণনার মাধ্যমে উদ্ধৃত করেছি। পরবর্তী ঘটনাও তাঁরই মুখে শুনুন। তিনি বলেনঃ “এ মিথ্যা অপবাদের গুজব কমবেশি এক মাস ধরে সারা শহরে ছড়াতে থাকে। নবী ﷺ মারাত্মক ধরনের মানসিক কষ্টে ভুগতে থাকেন। আমি কাঁদতে থাকি। আমার বাপ-মা চরম পেরেশানী ও দুঃখে-শোকে ভুগতে থাকেন।
শেষে একদিন রসূলুল্লাহ্ ﷺ আসেন এবং আমার কাছে বসেন। এ সমগ্র সময়-কালে তিনি কখনো আমার কাছে বসেননি। হযরত আবু বকর (রাঃ) ও উম্মে রুমান (হযরত আয়েশার মা) অনুভব করেন আজ কোন চূড়ান্ত সিদ্ধান্তকর কথা হবে। তাই তাঁরা দু’জনেও কাছে এসে বসেন।
রসূলুল্লাহ্ ﷺ বলেন, আয়েশা! তোমার সম্পর্কে আমার কাছে এই খবর পৌঁছেছে। যদি তুমি নিরপরাধ হয়ে থাকো তাহলে আশা করা যায় আল্লাহ তোমার অপরাধ মুক্তির কথা প্রকাশ করে দেবেন। আর যদি তুমি সত্যিই গোনাহে লিপ্ত হয়ে থাকো তাহলে আল্লাহর কাছে তাওবা করো এবং ক্ষমা চাও। বান্দা যখন তার গোনাহ স্বীকার করে নিয়ে তাওবা করে তখন আল্লাহ তা মাফ করে দেন। একথা শুনে আমার চোখের পানি শুকিয়ে যায়।
আমি আমার পিতাকে বলি, আপনি রসূলুল্লাহর কথার জবাব দিন। তিনি বলেনঃ “মা, আমি কিছু বুঝতে পারছিনা, কি বলবো।” আমি আমার মাকে বললাম, “তুমিই কিছু বলো” তিনিও একই কথা বলেন, “আমি কি বলবো বুঝতে পারছি না।” একথায় আমি বলি, আপনাদের কানে একটা কথা এসেছে এবং তা মনের মধ্যে জমে বসে গেছে।
এখন আমি যদি বলি, আমি নিরপরাধ এবং আল্লাহ সাক্ষী আছেন আমি নিরপরাধ--- তাহলে আপনারা তা মেনে নেবেন না। আর যদি এমন একটি কথা আমি স্বীকার করে নিই যা আমি করিনি--- আর আল্লাহ জানেন আমি করিনি--- তাহলে আপনারা তা মেনে নেবেন।
আমি সে সময় হযরত ইয়াকুবের (আঃ) নাম স্মরণ করার চেষ্টা করি কিন্তু নামটি মনে করতে পারিনি। শেষে আমি বলি, এ অবস্থায় আমার জন্য এছাড়া আর কি উপায় থাকে যে, আমি সেই একই কথা বলি যা হযরত ইউসুফের বাপ বলেছিলেন فَصَبْرٌ جَمِيلٌ (এখানে সে ঘটনার প্রতি ইঙ্গিত করা হয়েছে যখন হযরত ইয়াকুবের সামনে তার ছেলে বিন ইয়াইমিনের বিরুদ্ধে চুরির অপবাদের কথা বর্ণনা করা হয়েছিলঃ সূরা ইউসুফ ১০ রুকূ’তে একথা আলোচিত হয়েছে)।
একথা বলে আমি শুয়ে পড়ি এবং অন্যদিকে পাশ ফিরি। সে সময় আমি মনে মনে বলছিলাম, আল্লাহ জানেন আমি গোনাহ করিনি, তিনি নিশ্চয়ই সত্য প্রকাশ করে দেবেন। যদিও একথা আমি কল্পনাও করিনি যে, আমার স্বপক্ষে অহী নাযিল হবে এবং তা কিয়ামত পর্যন্ত পঠিত হতে থাকবে।
আল্লাহ নিজেই আমার পক্ষ সমর্থন করবেন। এ থেকে নিজেকে আমি অনেক নিম্নতর মনে করতাম। কিন্তু আমার ধারণা ছিল, রসূলুল্লাহ ﷺ কোন স্বপ্ন দেখবেন, যার মাধ্যমে আল্লাহ আমার নির্দোষিতার কথা জানিয়ে দেবেন। এরই মধ্যে রসূলুল্লাহ্র ﷺ ওপর এমন অবস্থার সৃষ্টি হয়ে গেলো যা অহী নাযিল হবার সময় হতো, এমন কি ভীষণ শীতের দিনেও তাঁর মুবারক চেহারা থেকে মুক্তোর মতো স্বেদবিন্দু টপকে পড়তে থাকতো। আমরা সবাই চুপ করে গেলাম। আমি তো ছিলাম একদম নির্ভীক। কিন্তু আমার বাপ-মার অবস্থা ছিল যেন কাটলে শরীর থেকে এক ফোঁটা রক্তও পড়বে না। তারা ভয় পাচ্ছিল, না জানি আল্লাহ কি সত্য প্রকাশ করেন। যখন সে অবস্থা খতম হয়ে গেলো তখন রসূলুল্লাহ্ ﷺ ছিলেন অত্যন্ত আনন্দিত।
তিনি হেসে প্রথমে যে কথাটি বলেন, সেটি ছিলঃ মুবারক হোক আয়েশা! আল্লাহ তোমার নির্দোষিতার কথা নাযিল করেছেন এবং এরপর নবী ﷺ দশটি আয়াত শুনান (অর্থাৎ ১১ নম্বর আয়াত থেকে ২০ নম্বর পর্যন্ত)। আমার মা বলেন ওঠো এবং রসূলুল্লাহ্র ﷺ প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করো। আমি বললাম, “আমি তাঁর প্রতিও কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করবো না, তোমাদের দু’জনের প্রতিও না। বরং আল্লাহর প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছি, যিনি আমার নির্দোষিতার কথা নাযিল করেছেন। তোমরা তো এ মিথ্যা অপবাদ অস্বীকারও করোনি।” (উল্লেখ্য, এটি কোন একটি বিশেষ হাদীসের অনুবাদ নয় বরং হাদীস ও সীরাতের কিতাবগুলোতে এ সম্পর্কিত যতগুলো বর্ণনা হযরত আয়েশার (রাঃ) উদ্ধৃত হয়েছে সবগুলোর সার নির্যাস আমি এখানে পরিবেশন করেছি)।
এ প্রসঙ্গে আরও একটি সূক্ষ্ম কথা অনুধাবন করতে হবে। হযরত আয়েশার (রাঃ) নিরপরাধ হবার কথা বর্ণনা করার আগে পুরো একটি রুকূ’তে যিনা, কাযাফ ও লি’আনের বিধান বর্ণনা করে মহান আল্লাহ প্রকৃতপক্ষে এ সত্যটির ব্যাপারে সবাইকে সচেতন করে দিয়েছেন যে, যিনার অপবাদ দেবার ব্যাপারটি কোন ছেলেখেলা নয়, নিছক কোন মাহফিলে হাস্যরস সৃষ্টি করার জন্য একে ব্যবহার করা যাবে না। এটি একটি মারাত্মক ব্যাপার। অপবাদদাতার অপবাদ যদি সত্য হয় তাহলে তাকে সাক্ষী আনতে হবে। যিনাকারী ও যিনাকারীনীকে ভয়াবহ শাস্তি দেয়া হবে। আর অপবাদ যদি মিথ্যা হয় তাহলে অপবাদদাতা ৮০ ঘা বেত্রাঘাত লাভের যোগ্য, যাতে ভবিষ্যতে সে আর এ ধরনের কোন কাজ করার দুঃসাহস না করে। এ অভিযোগ যদি স্বামী দিয়ে থাকে তাহলে আদালতে লি’আন করে তাকে ব্যাপারটি পরিষ্কার করে নিতে হবে। একথাটি একবার মুখে উচ্চারণ করে কোন ব্যক্তি ঘরে নিশ্চিন্তে বসে থাকতে পারে না। কারণ এটা হচ্ছে একটা মুসলিম সমাজ। সারা দুনিয়ায় কল্যাণ ব্যবস্থা কায়েম করার জন্য এ সমাজ প্রতিষ্ঠিত করা হয়েছে। এখানে যিনা কোন আনন্দদায়ক বিষয়ে পরিণত হতে পারে না এবং এর আলোচনাও হাস্য রসালাপের বিষয়বস্তুতে পরিণত হতে পারে না।
হাদীসে মাত্র কয়েকজন লোকের নাম পাওয়া যায়। তারা এ গুজবটি ছড়াচ্ছিল। তারা হচ্ছে আবদুল্লাহ্ ইবনে উবাই, যায়েদ ইবনে রিফা’আহ (এ ব্যক্তি সম্ভবত রিফা’আ ইবনে যায়েদ ইহুদী মুনাফিকের ছেলে), মিস্তাহ ইবনে উসামাহ, হাস্সান ইবনে সাবেত ও হামনা বিনতে জাহশ। এর মধ্যে প্রথম দু’জন ছিল মুনাফিক এবং বাকি তিনজন মু’মিন। মু’মিন তিন জন বিভ্রান্তি ও দুর্বলতার কারণে এ চক্রান্তের ফাঁদে জড়িয়ে পড়েছিলেন। এরা ছাড়া আর যারা কমবেশী এ গোনাহে জড়িয়ে পড়েছিলেন তাদের নাম হাদীস ও সীরাতের কিতাবগুলোতে আমার নজরে পড়েনি।
এর অর্থ হচ্ছে ভয় পেয়ো না। মুনাফিকরা মনে করছে তারা তোমাদের ওপর একটা বিরাট আঘাত হেনেছে। কিন্তু ইনশাআল্লাহ্ এটি উল্টো তাদের ওপরই পড়বে এবং তোমাদের জন্য ভালো প্রমাণিত হবে। যেমন আমি ইতিপূর্বে ভূমিকায় বর্ণনা করে এসেছি, মুসলমানদের শ্রেষ্ঠত্বের যে আসল ময়দান ছিল মুনাফিকরা সেখানেই তাদেরকে পরাস্ত করার জন্য এ প্রপাগাণ্ডা শুরু করে। অর্থাৎ নৈতিকতার ময়দান।
এখানে শ্রেষ্ঠত্ব লাভ করার কারণে তারা প্রত্যেকটি ময়দানে নিজেদের প্রতিপক্ষের ওপর বিজয় লাভ করে চলছিল। আল্লাহ তাকেও মুসলমানদের কল্যাণের উপকরণে পরিণত করে দিলেন। এ সময় একদিকে নবী ﷺ , অন্যদিকে হযরত আবু বকর ও তাঁর পরিবারবর্গ এবং তৃতীয় দিকে সাধারণ মু’মিনগন যে কর্মপদ্ধতি অবলম্বন করেন তা থেকে একথা দিবালোকের মতো সুস্পষ্টভাবে প্রমাণিত হয়ে গেছে যে, তাঁরা অসৎকর্ম থেকে কত দূরে অবস্থান করেন, কতটা সংযম ও সহিষ্ণুতার অধিকারী, কেমন ন্যায়নিষ্ঠ ও কি পরিমাণ ভদ্র ও রুচিশীল মানসিকতার ধারক। নবী ﷺ এর ইজ্জতের ওপর যারা আক্রমণ চালিয়েছিল তাঁর একটি মাত্র ইঙ্গিতই তাদের শিরচ্ছেদের জন্য যথেষ্ট ছিল, কিন্তু এক মাস ধরে তিনি সবরের সাথে সবকিছু বরদাশ্ত করতে থাকেন এবং আল্লাহর হুকুম এসে যাবার পর কেবলমাত্র যে তিনজন মুসলমানের বিরুদ্ধে কাযাফ তথা যিনার মিথ্যা অপবাদের অপরাধ প্রমাণিত ছিল তাদের ওপর ‘হদ’ জারি করেন। এরপরও তিনি মুনাফিকদেরকে কিছুই বলেননি।
হযরত আবু বকরের নিজের আত্মীয়, যার নিজের ও পরিবারের ভরণপোষন তিনি করতেন, সেও তাঁদের কলিজায় তীর বিঁধিয়ে দিতে থাকে কিন্তু এর জবাবে আল্লাহর এ নেক বান্দাটি না তার সাথে আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্ন করেন, না তার পরিবার-পরিজনকে সাহায্য-সহায়তা দেয়া বন্ধ করেন। নবীর পবিত্র স্ত্রীগণের একজনও সতীনের দুর্নাম ছড়াবার কাজে একটুও অংশ নেননি।
বরং কেউ এ অপবাদের প্রতি নিজের সামান্যতমও সন্তোষ, পছন্দ অথবা মেনে নেয়ার মনোভাবও প্রকাশ করেননি। এমনিক হযরত যয়নবের সহোদর বোন হাম্না বিনতে জাহ্শ নিছক নিজের বোনের জন্য তার সতীনের দুর্নাম রটাচ্ছিলেন কিন্তু তিনি স্বয়ং সতীনের পক্ষে ভালো কথাই বলেন।
হযরত আয়েশার নিজের বর্ণনা, রসূলের স্ত্রীগণের মধ্যে সবচেয়ে বেশী আড়ি চলতো আমার যয়নবের সাথে। কিন্তু “ইফ্ক”-এর ঘটনা প্রসঙ্গে রসূলুল্লাহ্ ﷺ যখন তাকে জিজ্ঞেস করেন, আয়েশা সম্পর্কে তুমি কি জানো? তখন এর জবাবে তিনি বলেন, হে আল্লাহর রসূল! আল্লাহর কসম, আমি তার মধ্যে ভালো ছাড়া আর কিছুই জানি না। হযরত আয়েশার নিজের ভদ্রতা ও রুচিশীলতার অবস্থা এই ছিল যে, হযরত হাস্সান ইবনে সাবেত তাঁর দূর্নাম রটাবার ব্যাপারে উল্লেখযোগ্য অংশগ্রহণ করেন কিন্তু এতদসত্ত্বেও তিনি সবসময় তাঁর প্রতি সম্মান ও বিনয়পূর্ণ ব্যবহার করেছেন।
লোকেরা স্মরণ করিয়ে দেয়, ইনি তো সেই ব্যক্তি যিনি আপনার বিরুদ্ধে দুর্নাম রটিয়েছিলেন। কিন্তু এ জবাব দিয়ে তিনি তাদের মুখ বন্ধ করে দেন যে, এ ব্যক্তি ইসলামের শত্রু কবি গোষ্ঠীকে রসূলুল্লাহ্ ﷺ ও ইসলামের পক্ষ থেকে দাঁতভাঙ্গা জবাব দিতেন। এ ঘটনার সাথে যাদের সরাসরি সম্পর্ক ছিল এ ছিল তাদের অবস্থা।
আর সাধারণ মুসলমানদের মানসিকতা কতদূর পরিচ্ছন্ন ছিল তা এ ঘটনা থেকে অনুমান করা যেতে পারে যে, হযরত আবু আইয়ুব আনসারীর স্ত্রী যখন তাঁর কাছে এ গুজবগুলোর কথা বললেন তখন তিনি বলেন, “আইয়ুবের মা! যদি সে সময় আয়েশার জায়গায় তুমি হতে, তাহলে তুমি কি এমন কাজ করতে?” তিনি বলেন, “আল্লাহর কসম, আমি কখনো এমন কাজ করতাম না।” হযরত আবু আইয়ুব বলেন, “তাহলে আয়েশা তোমার চেয়ে অনেক বেশী ভাল।
আর আমি বলি কি, যদি সাফওয়ানের জায়গায় আমি হতাম, তাহলে এ ধরনের কথা কল্পনাই করতে পারতাম না। সফওয়ান তো আমার চেয়ে ভালো মুসলমান।” এভাবে মুনাফিকরা যা কিছু চেয়েছিল ফল হলো তার একেবারে উল্টো এবং মুসলমানদের নৈতিক শ্রেষ্ঠত্ব আগের তুলনায় আরো বেশী সুস্পষ্ট হয়ে গেল।
এছাড়া এ ঘটনার মধ্যে কল্যাণের আর একটি দিকও ছিল। সেটি ছিল এই যে, এ ঘটনাটি ইসলামের আইন-কানুন, বিধি-বিধান ও তামাদ্দুনিক নীতি-নিয়মের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ সংযোজনের উপলক্ষ্যে পরিণত হয়। এর বদৌলতে মুসলমানরা আল্লাহর পক্ষ থেকে এমন সব নির্দেশ লাভ করে যেগুলো কার্যকর করে মুসলিম সমাজকে চিরকালের জন্য অসৎকর্মের উৎপাদন ও সেগুলোর সম্প্রসারণ থেকে সংরক্ষিত রাখা যেতে পারে আর অসৎকর্ম উৎপাদিত হয়ে গেলেও যথাসময়ে তার পথ রোধ করা যেতে পারে।
এছাড়াও এর মধ্যে কল্যাণের আর একটি দিকও ছিল। মুসলমানরা সকলেই একথা ভালোভাবে জেনে যায় যে, নবী ﷺ অদৃশ্য জ্ঞানের অধিকারী নন। যা কিছু আল্লাহ জানান তাই তিনি জানেন। এর বাইরে তাঁর জ্ঞান ততটুকুই যতটুকু জ্ঞান একজন মানুষের থাকতে পারে। একমাস পর্যন্ত হযরত আয়েশার (রাঃ) ব্যাপারে তিনি ভীষণ পেরেশান থাকেন। কখনো চাকরানীকে জিজ্ঞেস করতেন, কখনো পবিত্র স্ত্রীগণকে, কখনো হযরত আলীকে (রাঃ), কখনো হযরত উসামাকে (রাঃ)। শেষ পর্যন্ত হযরত আয়েশাকে (রাঃ) জিজ্ঞেস করলেও এভাবে জিজ্ঞেস করেন যে, যদি তুমি এ গোনাহটি করে থাকো, তাহলে তাওবা করো আর না করে থাকলে আশা করা যায় আল্লাহ তোমার নিরপরাধ হওয়া প্রমাণ করে দেবেন। যদি তিনি অদৃশ্য জ্ঞানের অধিকারী হতেন তাহলে এ পেরেশানী, এ জিজ্ঞাসাবাদ এবং এ তাওবার উপদেশ কেন? তবে আল্লাহর অহী যখন সত্য কথা জানিয়ে দেয় তখন সারা মাসে তিনি যা জানতেন না তা জানতে পারেন। এভাবে আকীদার অন্ধ আবেগের বশবর্তী হয়ে সাধারণত লোকেরা নিজেদের নেতৃবর্গের ব্যাপারে যে বাড়াবাড়ি ও আতিশয্যের শিকার হয়ে থাকে তা থেকে আল্লাহ সরাসরি অভিজ্ঞতা পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে মুসলমানদেরকে বাঁচার ব্যবস্থা করেন। বিচিত্র নয়, এক মাস পর্যন্ত অহী না পাঠাবার পেছনে আল্লাহর এ উদ্দেশ্যটাও থেকে থাকবে। প্রথম দিনেই অহী এসে গেলে এ ফায়দা লাভ করা যেতে পারতো না। (আরো বেশী বিস্তারিত জানার জন্য দেখুন তাফহীমুল কুরআন, আন্ নাম্ল, ৮৩ টীকা)।
অর্থাৎ আবদুল্লাহ্ ইবনে উবাই। সে ছিল এ অপবাদটির মূল রচয়িতা এবং এ কদর্য প্রচারাভিযানের আসল নায়ক। কোন কোন হাদীসে ভুলক্রমে হযরত হাস্সান ইবনে সাবেতকে (রাঃ) এ আয়াতের লক্ষ্য বর্ণনা করা হয়েছে। কিন্তু এটা মূলত বর্ণনাকারীদের নিজেদেরই বিভ্রান্তির ফল। নয়তো হযরত হাস্সানের (রাঃ) দুর্বলতা এর চেয়ে বেশী কিছু ছিল না যে, তিনি মুনাফিকদের ছড়ানো এ ফিত্নায় জড়িয়ে পড়েন। হাফেয ইবনে কাসীর যথার্থ বলেছেন, এ হাদীসটি যদি বুখারী শরীফে উদ্ধৃত না হতো, তাহলে এ প্রসঙ্গটি আলোচনাযোগ্যই হতো না। এ প্রসঙ্গে সবচেয়ে বড় মিথ্যা অপবাদ হচ্ছে এই যে, বনী উমাইয়াহ হযরত আলী রাদিয়াল্লাহু আনহুকে এ আয়াতের লক্ষ্য মনে করে। বুখারী, তাবারানী ও বাইহাকীতে হিশাম ইবনে আবদুল মালিক উমুবীর উক্তি উদ্ধৃত হয়েছে। তাতে বলা হয়েছে الَّذِى تَوَلَّى كِبْرَهُ অর্থ হচ্ছে আলী ইবনে আবু তালেব। অথচ এ ফিত্নায় হযরত আলীর (রাঃ) গোড়া থেকেই কোন অংশ ছিল না। ব্যাপার শুধু এতটুকু ছিল, যখন তিনি নবী ﷺ কে খুব বেশী পেরেশান দেখেন, তখন নবী ﷺ তাঁর কাছে পরামর্শ চাওয়ায় তিনি বলেন, আল্লাহ এ ব্যাপারে আপনাকে কোন সংকীর্ণ পরিসরে আবদ্ধ রাখেননি, বহু মেয়ে আছে, আপনি চাইলে আয়েশাকে তালাক দিয়ে আর একটি বিয়ে করতে পারেন। এর অর্থ কখনোই এটা ছিল না যে, হযরত আয়েশার বিরুদ্ধে যে মিথ্যা অপবাদ দেয়া হচ্ছিল হযরত আলী তাকে সত্য বলেছিলেন। বরং শুধুমাত্র নবী ﷺ এর পেরেশানী দূর করাই ছিল এর উদ্দেশ্য।
ফী জিলালিল কুরআন:
*ইতিহাসের জঘন্যতম একটি অপবাদ : কাউকে অপবাদ দেয়ার শাস্তির বর্ণনা শেষে এখন অপবাদের একটি উদাহরণ পেশ করা হচ্ছে, যার দ্বারা এ কদর্য কাজের ক্ষতি কতাে বেশী তা স্পষ্ট হয়ে উঠবে, আর এ ঘটনাটি ঘটেছিলো খােদ রসূল(স.)-এর বাড়ীতেই এবং এর দ্বারা তার মান সম্মানের ওপর প্রচন্ড আঘাত হানা হয়েছিলাে, অথচ আল্লাহর নযরে তিনি হচ্ছেন সকল মানুষের সেরা মানুষ, বিশ্ব মানবতার শ্রেষ্ঠ আদর্শ।
আল্লাহর রসূল(স.)-এর কাছে সব থেকে প্রিয় মানুষ সিদ্দীকে আকবার হযরত আবু বকর(রা.)-এর সম্মানের ওপর আঘাত হানা হয়েছিলাে, আঘাত হানা হয়েছিলাে এমন একজন সাহাবীর ওপর যার সম্পর্কে আল্লাহর রসূল(স.) নিজে সার্টিফিকেট দিচ্ছেন যে তার সম্পর্কে ভাল ছাড়া মন্দ কিছু তিনি জানেন না এবং এক সময়ে পুরাে একমাস ধরে রসূল(স.)-এর স্থলাভিষিক্ত করে মদীনার শাসনকর্তা হিসাবে দায়িত্ব দেয়া হয়েছিলাে।
দেখুন মানুষ কতােদূর নিষ্ঠুর হতে পারে এবং হিংসার বশবর্তী হয়ে কতাে কঠিন কাজ করতে পারে। আরবের মধ্যে আগত মানবকুল শিরােমনি, শ্রেষ্ঠ নবী ও দয়ামায়ার প্রতিমূর্তি প্রাণপ্রিয় মুহাম্মদ(স.)-এর পরিবারের ওপর নিছক কল্পনার ঘােড়ায় সওয়ার হয়ে যে কলংক লেপন করা হয়েছিলাে তার বিষাক্ত ছােবলের বেদনা তৎকালীন গােটা মুসলিম সমাজকে জর্জরিত করেছিলাে। এই কঠিন ঘটনাকে পূর্ণ দীর্ঘ একটি অধ্যায়ব্যাপী আল্লাহ রব্বুল আলামীন নিজেই বিবৃত করেছেন, 'যারা অপবাদ-এর ঘটনাটা তৈরী করে আনলাে তারা তাে ছিলাে তােমাদের মধ্য থেকে ছােট একটি দল... ওরা যা কিছু বলছে তার থেকে খুব নিষ্ঠাবান মােমেন ব্যক্তিরা পবিত্র ও দায়িত্ব মুক্ত।'(আয়াত ১১-২৬) এ আয়াতসমূহে যে ঘটনাটার বিবরণ এসেছে তা হচ্ছে মিথ্যা এক রটনা।
এ ঘটনা মানবেতিহাসের সব থেকে পবিত্র কিছু মানুষের জীবনকে কষ্টের মধ্যে ফেলে দিয়েছিলাে, তাদের জীবনকে অসহনীয় বেদনায় ভরে দিয়েছিলাে তাদের অন্তরগুলাে অসহ্য যন্ত্রণায় ছটফট করে উঠেছিলাে, গােটা মুসলিম উম্মতকে তারা এমন এক অব্যক্ত কষ্টের মধ্যে ফেলে দিয়েছিলাে যার নযির সুদীর্ঘ ইতিহাসের পাতায় আর কোথাও খুঁজে পাওয়া যায় না, ব্যথায় দরদের নবী আল্লাহর প্রিয়তম হাবীবকে জর্জরিত করেছিলাে, তার পরম প্রিয় পত্মী মােমেন মাতা বিবি আয়শা(রা.)-এর হৃদয়কে ভেংগে চুরমার করে দিয়েছিলাে, সিদ্দীকে আকবার ও তার মমতাময়ী পত্নীর অন্তরকে পেরেশান করে দিয়েছিলাে, সরল সহজ নিরপরাধ ও রাসূল(স.)-এর পরম আস্থাভাজন মােয়াত্তাল ইবনে সাফওয়ান এর সম্ভ্রম ও ব্যক্তিত্বকে লজ্জা শরমে ও মর্মবেদনায় ধূলায় মিশিয়ে দিয়েছিলাে, তার সম্পর্কে দুর্নাম ছড়িয়ে মানুষের মনে তার সম্পর্কে সন্দেহ সংশয় সৃষ্টি করা হয়েছে, আর মাসাধিককাল ধরে অনিশ্চয়তার কঠিন দুশ্চিন্তার মধ্যে রাখা হয়েছে, তার জীবনকে অসহ্য যন্ত্রণায় ভরে দেয়া হয়েছে। সুতরাং আসুন, নিদারুণ সে ব্যথা-বেদনার করুণ কাহিনী মা আয়শার নিজের যবানীতেই আমরা শুনি, যা ওপরের আয়াতগুলােতে বিবৃত ঘটনাকে আমাদের সামনে একটি জীবন্ত ছবি ভাসিয়ে তুলবে, যুহরী, ওরওয়া এবং আরাে অনেকে হযরত আয়েশা(রা.) থেকে ঘটনাটি নিম্নরূপে বর্ণনা করেছেন, তিনি বলছেন, রাসূল(স.) যখনই কোনাে সফরের এরাদা করতেন যে কোনাে একজন স্ত্রীকে সাথে নিতেন, আর এজন্যে তাদের মধ্যে কখন কাকে নেবেন তা লটারী দ্বারা নির্ধারণ করে নিতেন, যার নাম লটারিতে উঠতাে তাকেই সাথে নিতেন।
পঞ্চম হিজরীতে অনুষ্ঠিত গাযওয়ায়ে বনী মােস্তালিকের উদ্দেশ্যে রওয়ানা হওয়ার সময়ে লটারীতে আমার নাম উঠলাে। অতপর, তার সাথে আমি রওয়ানা হই, এ সময়ে হিজাব বা পর্দার আয়াত নাযিল হয়ে গিয়েছিলাে। আর আমাকে উটের পিঠে রক্ষিত হাওদাজে তুলে নিয়ে যাওয়া হচ্ছিলাে। এ হাওদাজে আমি নিজেই ওঠা-নামা করতাম। এভাবেই আমরা এগিয়ে গেলাম। অবশেষে রসূল(স.)ও যুদ্ধে বিজয়ী হয়ে মদীনার পথে আমাদেরকে নিয়ে রওয়ানা হলেন। পথে এক জায়গায় কাফেলা যাত্রাবিরতি করলাে, আমরা তখন মদীনার কাছাকাছি পৌছে গিয়েছিলাম।
এমন সময় রাত্রিতে কাফেলাকে রওয়ানা হওয়ার ঘােষণা শােনানাে হলাে। যখন এ ঘােষণা দেয়া হচ্ছিলাে তখন আমি একটু প্রাকৃতিক প্রয়ােজনে বাইরে গিয়েছিলাম। কাজ সেরে আসার সময় বুকে হাত দিয়ে দেখলাম আমার হারটি নেই। বুঝলাম আমার নখে লেগে হারটি ছিড়ে পড়ে গেছে। ফিরে গেলাম হারটি খুঁজতে, খুঁজতে খুঁজতে বেশ কিছু সময় দেরী হয়ে গেলো।
ইতিমধ্যে কাফেলার রওয়ানা হওয়ার সময় হয়ে গেছে ও যারা আমার হাওদাটি উটের পিঠে উঠানাে নামানাের দায়িত্বে ছিলাে, তারা হাওদাটির পর্দা পড়ে থাকার কারণে, হাওদাটি উটের পিঠে তুলে বেঁধে দিলাে কিন্তু আমি ভেতরে নেই এটা টেরও পেলাে না।
এ সময়ে আমার বয়সও খুবই কম ছিলাে (বছর চৌদ্দ হবে), শারীরিক দিক দিয়ে আমি খুব ক্ষীণ স্থাস্থ্যের অধিকারী ছিলাম, কারণ আমরা কোনােরকমে এক-মুষ্টি খেয়ে উঠে যেতাম। এজন্যে তারা মনে করেছিলাে আমি ভেতরেই আছি। এভাবে তারা উটটিকে কাফেলার সাথে চালিয়ে দিলাে। আমি হারটি খুঁজে পেয়ে ফিরে এসে দেখি, সবাই বেশ অগ্রসর হয়ে গেছে। কেউ নেই, সবাই চলে গেছে। এজন্যে যেখানে ছিলাম, সেখানেই বসে পড়লাম, আর আমি ভাবলাম, কিছু দূরে গিয়ে অবশ্যই তারা আমার অনুপস্থিতি টের পেয়ে আমার খোঁজে ফিরে আসবে। আমি বসে থাকতে থাকতে প্রবল ঘুম পেলাে, কাজেই আমি ঘুমিয়ে পড়লাম ।
এ সময় সাফওয়ান ইবনে মােয়াত্তাল, যাকে পেছনে রেখে যাওয়া কোনাে জিনিস কুড়িয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্যে নিযুক্ত করে রাখা হয়েছিলাে সেই ব্যক্তি সেই স্থানে এসে হাযির যেখানে আমি ছিলাম। সে দূর থেকে এক ব্যক্তিকে ঘুমন্ত অবস্থায় দেখে আমার কাছে এলাে এবং আমাকে দেখে চিনে ফেললাে, আর সে ব্যক্তি আমাকে হেজাবের আয়াত নাযিল হওয়ার পূর্বে দেখেছে, সে বুঝে গেলাে কিছু একটা দুর্ঘটনা ঘটেছে এজন্যে বলে উঠলো, ইন্না লিল্লাহে ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন' এ আওয়ায শুনে আমি জেগে উঠলাম এবং চাদর দিয়ে আমার চেহারা ঢেকে ফেললাম।
আল্লাহর কসম, সে আমার সাথে একটি কথাও বললাে না এবং আমি তার বিপদকালীন দোয়া ইন্না লিল্লাহে... রাজেউন পড়া ছাড়া আর কোনাে আওয়াযই শুনিনি। সে ব্যক্তি একটু চিন্তা করে তার বাহন উটনীটাকে বসতে বললাে। উটনী তার সামনের দুই পা বাড়িয়ে বসে পড়লাে, তারপর আমি তার ওপর সওয়ার হলাম। তখন সে এই বাহনটিকে এগিয়ে নিয়ে চললাে। অবশেষে আমাদের বাহিনীর কাছে আমরা পৌছে গেলাম, যেখানে তারা পেছনে কিছু রয়ে গেলাে কিনা খোজ করার জন্যে কিছুক্ষণের জন্যে যাত্রা বিরতি করেছিলাে।
রেওয়ায়াতকারী বলেন, আয়শা(রা.) বলেন, এ সময় আমার মান-সম্মান ধ্বংস করতে গিয়ে মূলত ধ্বংস হলো সেই ব্যক্তি বা ব্যক্তিবর্গ যার কিংবা যাদের এই ধ্বংস হওয়া পাওনা হয়ে গিয়েছিলাে। এসময়ে এ গুনাহের কাজে এসব থেকে বড় অংশ নিয়েছিলাে যে ব্যক্তি সে ছিলাে আবদুল্লাহ ইবনে উবাই (মােনাফেক-সর্দার)। তারপর আমরা মদীনায় পৌছুলাম, এরপর আমি পুরাে মাস খানেক ধরে অসুস্থ ছিলাম।
এ সময়ের মধ্যে এ রটনা সম্পর্কিত ব্যক্তিদের সম্পর্কে মানুষ অনেক কিছু বলাবলি করেছে। কিন্তু আমি এর কিছুই জানতে পারিনি। তবে আমার অসুস্থাবস্থায় একটি জিনিস আমার মনে খটকা জাগাতাে, তা হচ্ছে অন্য সময় অসুস্থ হলে রসূল(স.) যে হৃদয়াবেগ নিয়ে আমার কাছে আসতেন, বসতেন এবং দরদের সাথে আমার খোঁজ খবর নিতেন, এ সময়ে কিন্তু আমি সেই মমতাপূর্ণ ব্যবহারটা দেখছিলাম না। তিনি অবশ্য আসতেন, সালাম করতেন এবং শুধু জিজ্ঞাসা করতেন, কেমন আছাে? ব্যস, এরপর চলে যেতেন।
এই আচরণটাই তাঁর সম্পর্কে আমার মনে কিছু সংশয় সৃষ্টি করেছিলাে, কিন্তু সুস্থ না হওয়া পর্যন্ত আমি আসল ব্যাপারটার কিছুই বুঝতে পারিনি। এরপর এক রাত্রিতে আমি এবং মিসতাহির মা প্রাকৃতিক প্রয়ােজন সারার জন্যে জংগলের দিকে যাচ্ছিলাম, সেখানেই আমরা রাত্রিতে গিয়ে প্রয়ােজন সারতাম- এ ঘটনা হচ্ছে সে সময়ের কথা যখন নিয়মিত কোনাে শৌচাগার (টয়লেট) তৈরী হতে পারেনি, আর এজন্যে আমরা রাত ছাড়া বেরুতাম না।
এক রাত থেকে আর এক রাত পর্যন্ত আমাদের ধৈর্য ধরে থাকতে হতাে। আমরা পূর্বের আরবদের মতােই এভাবে মল ত্যাগ করতে অভ্যস্থ ছিলাম। অতপর আমি এবং উম্মে মিসতাহ এগিয়ে যাচ্ছিলাম, এ মহিলাটি মা ও বাবা উভয়ের দিক দিয়ে মােত্তালেব বংশের মেয়ে, এজন্যে তার ছেলে মােত্তালেব বংশীয়। আমরা প্রয়ােজন সেরে ফিরে আসছিলাম, এমন সময় উম্মে মেসতাহ তার চাদরের আঁচলে বেধে পড়ে গেলাে, আর অমনি বিরক্ত হয়ে সে বলে উঠলাে, 'তায়েসা মিসতাহ (মরুক মিসতাহ)! একথা শুনে আমি বললাম, ছি: তুমি বড়ই নিকৃষ্ট কথা বললে উম্মে মিসতাহ, তুমি গালি দিলে এমন এক ব্যক্তিকে যে বদর যুদ্ধে যােগ দিয়েছে। তখন সে বললাে, রাখে তার কথা, হায়, তুমি শােননি সে কী কথা বলেছে? জিজ্ঞাসা করলাম, কী বলেছে সে? তখন সে রটনার ঘটনাটি সবিস্তারে বললাে।
এর ফলে আমার পূর্বের অসুস্থতার সাথে আমার অসুখ আরাে বেড়ে গেলাে। তারপর আমি বাড়ীতে ঢুকতেই রসূল(স.) ঘরে ঢুকলেন এবং বললেন, কেমন আছাে? তখন আমি শুধু বললাম, আমাকে বাপের বাড়ী যাওয়ার অনুমতি দিন। সেখানে গিয়ে তাদের সামনেই ব্যাপারটা সম্পর্কে আমি নিশ্চিত হতে চাচ্ছিলাম। তখন তিনি আমাকে অনুমতি দিলেন এবং তারপর আমি বাপ-মার কাছে চলে এলাম। অতপর মাকে বললাম, মা, লােকেরা এসব কী বলাবলি করছে? তিনি বললেন, তাের ওপর এই রটনার ব্যাপারটা আমাকে, আমার মান সম্ভম শেষ করে দিয়েছে; এটাই দুনিয়ার রীতি; যখনই কোনাে মেয়ে সৌভাগ্যবতী হয়ে যায়, স্বামী সােহাগিনী হয়, স্বামীও তাকে ভালোবাসি, উপরস্তু যদি কয়েকজন সতীন থাকে, তাহলে তখনই তার বিরুদ্ধে হিংসুটে কিছু লােক এই ধরনের মিথ্যা রটনা করে তার মান-সম্ভ্রম নষ্ট করার অপপ্রয়াস চালায়, সতীনরাও এতে কিছু সুযােগ নেয়ার চেষ্টা করে।
এসব শুনে আমি বললাম, সােবহানাল্লাহ, আর এই নিয়ে লােকেরাও এমনভাবে বলাবলি করতে পারছে রেওয়ায়াতকারী বলছেন, তিনি বললেন, অতপর, সারারাত ধরে আমি কাঁদলাম, সকাল হয়ে গেলাে, এক মুহূর্তের জন্যেও আমার চোখের পানি থামেনি এবং সারা রাতের মধ্যে একটিবারের জন্যও আমার চোখের পাতা বন্ধ হয়নি, তারপর ক্রন্দনরত অবস্থাতেই সকাল করেছি।
এরপর (জানলাম) রসূল(স.) আলী ইবনে আবু তালেব এবং ওসামা ইবনে যায়েদ রাদিয়াল্লাহ আনহুমাকে ডাকলেন, এ সময়ের মধ্যে, অর্থাৎ এই যে রটনার কল্পিত কাহিনী যে সময়টাতে মুখে মুখে চালাচালি হচ্ছিলাে এই সুদীর্ঘকালের মধ্যে ওহী আসাও বন্ধ ছিলাে। তাই, সে দু'জনের সাথে রসূল(স.) পৃথক পৃথকভাবে তার পরিবার সম্পর্কে পরামর্শ করলেন। রেওয়ায়াতকারীরা বলছেন, আয়শা(রা.) বললেন, রাসূল(স.) ওসামাকে তার স্ত্রীর সতীত্ব ও রটনাকারীদের প্রতি তার মমত্ববােধের প্রতি ইংগিতও করলেন। তখন ওসামা(রা.) পরামর্শ দান করতে গিয়ে বললেন, ইয়া রসূলাল্লাহ, এরা তাে আপনার পরিবার, আল্লাহর কসম, আমরা ভালাে ছাড়া মন্দ কিছু (এদের সম্পর্কে) জানিনা (অনুমানও করি না)।
আর আলী ইবনে আবী তালেব এর কাছে পরামর্শ চাইলে সে বললাে, ইয়া রসূলাল্লাহ, আল্লাহ তায়ালা আপনাকে সংকটের মধ্যে না রাখুন (অর্থাৎ, আল্লাহ তায়ালা আপনাকে মানসিক ও যন্ত্রণা থেকে রেহাই দিন) তিনি ছাড়া আরাে অনেকেই আছেন (এই একজনের বিষয় নিয়ে) আপনি এতাে বেশী মন খারাপ করবেন না। সে কাজের মেয়েটা রয়েছে, তাকে জিজ্ঞাসা করুন না, সে আপনাকে কিছু জানাতে পারবে।
যাই হােক, রাসূল(স.) বরীরা(রেওয়ায়াতকারী হয়ত আন্দাযে বরীর নাম বলেছেন, কারণ ইবনে কাইয়েম বিশ্বস্ত সূত্রের বরাত দিয়ে উল্লেখ করেছেন যে, বরীরা এর অনেক আগেই দাসত্ব থেকে মুক্তি লাভ করেছিলেন) (কাজের মেয়েকে ডাকলেন, বললেন, বারীরা, ওর (আয়শার) মধ্যে তুমি কি এমন কিছু দেখেছে যাতে তােমার মনে তার চরিত্র সম্পর্কে কোনাে সন্দেহ জাগতে পারে? সে বললাে, জ্বি না, যিনি আপনাকে সত্যের নবী বানিয়ে পাঠিয়েছেন, সেই মহান আল্লাহর কসম, আমি যেটুকু দেখেছি তাতে মাত্র এতােটুকু ব্যাপারে তাকে দোষ দিতে পারি অল্প বয়সী মেয়ে তাই (তার বয়স বড়জোর হয়তাে এই বছর পনের হবে) কখনাে কখনাে আটা মাখতে মাখতে ঘুমিয়ে পড়ে, আর ছাগল এসে তা খেয়ে যায়, আয়শা(রা.) বলছেন, এরপর রসূল মুসলমানদের খুবই গুরুত্বপূর্ণ কিছু বলার জন্যে সন্ধার পূর্বে মসজিদের মিম্বারের ওপর উঠলেন এবং চাইলেন যে আবদুল্লাহ ইবনে উবাই-এর কাজের ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে কেউ কিছু বলুক।
তিনি এবারে সুস্পষ্টভাবে বললেন, কে আছে সে ব্যক্তির পক্ষে কথা বলার যে আমার পরিবার সম্পর্কে মিথ্যা রটনা করে আমাকে কষ্ট দিয়েছে? শােনাে তােমরা, আমি আল্লাহর কসম খেয়ে বলছি, আমার পরিবার সম্পর্কে আমার মনে কোনাে সন্দেহ নেই, তার সম্পর্কে আমি ভাল ছাড়া আর কিছুই জানি না, আর ওরা এমন এক ব্যক্তির কথা বলাবলি করেছে, এ পর্যন্ত তার বিরুদ্ধে ভাল ছাড়া মন্দ বলার মতাে আমি কিছু পাইনি, সে আমার সাথে ছাড়া আমার পরিবারের মধ্যে কখনাে প্রবেশ করেনি।
বর্ণনাকারীর মতে আয়শা(রা.) বলেন, এসময়ে সা’দ ইবনে মােয়ায(রা.) উঠে দাড়ালেন [এখানেও কিছু অস্পষ্টতা রয়ে গেছে, ইবনে ইসহাক এর একটি রেওয়ায়েতে জানা যায়, যার কথা এখানে বলা হয়েছে তিনি সা'দ বিন মােয়ায নন, এ ঘটনার অনেক আগেই গাযওয়ায়ে বনী কুরায়যার সময়েই তার ইন্তেকাল হয়েছিলাে। ভুলক্রমে তার কথা এখানে বলা হয়েছে। প্রকৃতপক্ষে যে ব্যক্তির উল্লেখ এখানে এসেছে, তিনি ছিলেন উসায়েদ ইবনে হুযায়ের (ইবনে কাইয়েমও এভাবে বলেছেন) ইবনে হাযম এ ঘটনার যে বর্ণনা দিয়েছেন তাতে সা'দ ইবনে মুয়ায এর উল্লেখ নেই] এবং বললেন, আল্লাহর কসম, আমি তার পক্ষ থেকে কথা বলছি, যদি সে আওস গােত্রের লােক হয় তাহলে তার গর্দান মেরে দেবাে, আর যদি সে লােক আমাদের ভাই খাযরাজ গোত্রের মধ্য থেকে হয় তাহলে তার ব্যাপারে আমি আপনার হুকুম পালন করবাে।
তখন, খাযরাজ গােত্রের নেতা সা’দ এবনে ওবাদাহ উঠে বললেন, (এ ব্যক্তি মানুষ হিসাবে ভালাে মানুষই ছিলেন কিন্তু তাকে বংশীয় মর্যাদাবােধ পেয়ে বসলাে) তিনি সা'দ ইবনে মােয়াযকে বললেন, আল্লাহর স্থায়িত্বের কসম, তুমি মিথ্যা বলেছো, না কিছুতেই তুমি তাকে হত্যা করবে না, আর তুমি পারবেও না তাকে হত্যা করতে। তখন সা'দ ইবনে মােয়াযের চাচাত ভাই উসায়েদ এবনে হায়ের(রা.) ওঠে দাড়িয়ে সা’দ এবনে ওবাদাকে বললেন, চিরন্তন ও মহান আল্লাহর কসম, অবশ্যই আমরা তাকে কতল করবাে। তুমি মুনাফিক, মুনাফিকের পক্ষে ওকালতি করছে।
তখন আওস ও খাযরাযের বেওকুফ লােকেরা গরম হয়ে উঠলাে এবং তারা পরস্পরে লড়াই করতে উদ্যত হয়ে গেলাে, অথচ রসূল(স.) তখনও মিম্বারের ওপর বসা। তিনি বরাবর তাদেরকে থামানাের চেষ্টা করে যাচ্ছিলেন, অবশেষে তারা চুপ করলাে এবং রসূল(স.) মিম্বর থেকে নেমে পড়লেন।
সেদিন সারাটা দিন ধরে আমি কাদলাম, এক মুহূর্তের জন্যেও আমার অশ্রু থামেনি আর সারা রাত ধরে আমি চোখে একটুও ঘুমের সুরমা লাগাইনি। এর পরের রাত্রিতেও আমি ক্রন্দনরত অবস্থায় বিনিদ্র রজনী যাপন করলাম। তারপর সকালে আমার আব্বা আম্মা আমার কাছে এলেন।
এসময়ে পুরাে দুটো রাত ও এক দিন আমার কাঁদতে কাঁদতে কেটে গেছে, এমনকি আমার মনে হচ্ছিলাে আমার কলিজা ফেটে যাবে। আব্বা আম্মা আমার কাছে বসে আর আমি কেঁদে চলেছি, এমন সময় আনসারদের মধ্য থেকে এক মহিলা ভেতরে আসার অনুমতি চাইছিলাে, তাকে অনুমতি দেয়া হলাে, সে ঢুকেই আমার সাথে বসে কাঁদতে শুরু করলাে। আমাদের এই কান্নাকাটি চলছিলাে, এমন সময় আমাদের কাছে রাসূল(স.) এসে হাযির। তিনি বসলেন অথচ যখন থেকে এসব কথা বলাবলি শুরু হয়েছিলাে তখন থেকে একটি দিনের সামান্য কিছু সময়ের জন্যেও তিনি আমার কাছে বসেননি, আর পুরাে একটি মাস কেটে গেছে, এর মধ্যে আমার সম্পর্কে কোনাে ওহীও আসেনি।
তিনি বসে কালেমায়ে শাহাদাত পড়লেন, তারপর বললেন, 'শােনাে, তােমার সম্পর্কে আমার কাছে এই কথা পৌঁছেছে, তুমি নির্দোষ থাকলে অবশ্যই আল্লাহ তায়ালা তােমাকে দোষমুক্ত করবেন, আর যদি তুমি কোনাে দোষে জড়িত হয়ে থাকো তাহলে আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাও এবং তাঁর কাছে তাওবা করাে, শোনাে, বান্দা দোষ করে যখন দোষ স্বীকার করে এবং তাওবা করে তখন আল্লাহ তায়ালা তার তাওবা কবুল করেন।
রসূল(স.) যখন তার কথা শেষ করলেন তখনও আমার অশ্রু ঝরছিলাে, অবশেষে অশ্রু শেষ হয়ে গেলাে চোখে এক ফোটা অশ্রুও আর রইলাে না, তখন আমি আমার আব্বাকে বললাম। আব্বা, রাসূল(স.) যা বললেন, আপনিই আমার পক্ষ থেকে তার জওয়াব দিন। তিনি বললেন, আল্লাহর কসম, রাসূল(স.)-কে আমি যে কী বলবাে আমি তাে তা জানিনা।
তখন আমি মাকে বললাম, আম্মা রসূল(স.) যা বললেন আমার পক্ষ থেকে আপনি তার জওয়াব দিন না। তিনিও বললেন, আল্লাহর কসম, আমি জানিনা রসূল(স.)-কে আমি কী বলবাে।
বর্ণনাকারী বলছেন, আয়শা(রা.) বললেন, 'আমি অত্যন্ত কম বয়সী একটি মেয়ে, কোরআন থেকেও আমি বেশী কিছু পড়িনি। তখন আরাে আমি বললাম, আল্লাহর কসম আমি জানি, মানুষ যা বলাবলি করেছে তা আপনারা শুনেছেন, কথাগুলাে আপনাদের মনে দাগ কেটেছে এবং আপনারা বিশ্বাস করেছেন।
এখন আমি যদি আপনাদেরকে বলি আমি দোষমুক্ত আপনারা তা বিশ্বাস করবেন না, আর যদি আমি আপনাদের কাছে কোনাে অপরাধ স্বীকার করি, অথচ আল্লাহ তায়ালা জানেন আমি তার থেকে মুক্ত, তাহলে সেটাও আপনারা বিশ্বাস করবেন না।
সুতরাং, আল্লাহর কসম, আমার ও আপনাদের জন্যে এ ছাড়া আর কোনাে উদাহরণ পাই না, যা ইউসুফ(আ.)-এর বাপ বলেছিলেন, একবার সে ঘটনাটা স্মরণ করুন, তিনি বলেছিলেন, সুতরাং (আমি) সুন্দরভাবে সবর করছি, আর যা কিছু তােমরা বলছো, সে বিষয়ে আল্লাহ তায়ালাই আমার একমাত্র সাহায্যকারী।
এর পর আমি ঘুরে বসলাম ও বিছানার ওপর শুয়ে পড়লাম। আল্লাহর কসম, এসময়ে আমি জানি যে আমি নিরপরাধ, অবশ্যই আল্লাহ তায়ালা আমার দোষমুক্তির কথা ঘোষণা করবেন। কিন্তু আমি আল্লাহর কসম ভাবতেও পারিনি যে তিনি আমার সম্পর্কে আল কোরআনের আয়াত নাযিল করবেন, আর মানুষ তা পড়তে থাকবে। আমি তাে আমার মনের মধ্যে, নিজেকে এতাে ছােটো মনে করতাম যে আমার সম্পর্কে আল্লাহ তায়ালা কথা বলবেন, আর তা পঠিত হবে- এটা কিছুতেই হতে পারে না, বরং আমি আশা করছিলাম যে রসূল(স.) ঘুমের মধ্যে স্বপ্ন দেখবেন যার দ্বারা আল্লাহ তায়ালা আমার দোষ মুক্তির ঘােষণা দেবেন।
কিন্তু, কী আশ্চর্য, আল্লাহর কসম, সে বৈঠক শেষ হতে পারেনি, বাড়ীর কেউ বেরিয়েও যেতে পারেনি। এরই মধ্যে আল্লাহ তায়ালা তার নবী(স.)-এর কাছে (আয়াত) নাযিল করলেন। অতপর দেখা গেলাে তার পবিত্র মুখমন্ডল হাসিতে উদ্ভাসিত হয়ে গেছে, দেখা যাচ্ছে খুশীতে তাঁর দাঁতের ফাঁকগুলাে পর্যন্ত দেখা যাচ্ছে, এসময় প্রথম যে কথাটা তিনি বললেন, তা ছিলাে আমার প্রতি, তিনি আমাকে বললেন, ওহে আয়শা, আল্লাহর প্রশংসা করে তার শােকর আদায় করাে তিনি তােমাকে দোষ মুক্ত করেছেন, তিনি তােমার দোষ মুক্তির ঘােষণা দিয়েছেন।
তখন আমার মা আমাকে বললেন, ওঠো, রসূল(স.)-এর কাছে যাও। তখন আমি বললাম, আল্লাহর কসম, আমি তার কাছে যাবাে না এবং আল্লাহ তায়ালা ছাড়া আর কারাে শােকর আদায় করবাে না যেহেতু একমাত্র তিনিই আমার দোষ মুক্তির কথা ঘােষণা করে আয়াত নাযিল করেছেন।
অতপর, দেখুন আল্লাহ তায়ালা নাযিল করেছেন, 'নিশ্চয়ই যারা অপবাদ রটনা করেছে, তারা তােমাদের মধ্য থেকে অসদুদ্দেশ্যে গঠিত একটি দল মাত্র...' এভাবে পুরাে দশটি আয়াত নাযিল হলাে মােমেন কুলের মা আয়শা(রা.) সম্পর্কে, তারপর আল্লাহ তায়ালা আমার দোষ মুক্তির কথা যখন নাযিল করলেন তখন আবু বকর সিদ্দীক(রা.) (যিনি মিসতাহির দৈন্যদশা ও আত্মীয়তার কারণে তাকে নানাভাবে সাহায্য করতেন) বললেন, মিসতাহ আয়শা সম্পর্কে যা বলেছে, আল্লাহর কসম তাকে আর কোনাে দিন আমি কিছু মাত্র সাহায্য করবো না।
এ কথার পর আল্লাহ তায়ালা নাযিল করলেন, 'না, তােমাদের মধ্যে সম্মানী ও সচ্ছল লােক যারা আছে, তারা আর সাহায্য করবে না বলে যেন কসম না খায়... আর আল্লাহ তায়ালা মাফ করনেওয়ালা মেহেরবান' পর্যন্ত নাযিল হলাে। তখন আবু বকর(রা.) বললেন, আল্লাহর কসম, অবশ্যই আমি পছন্দ করি যে আল্লাহ তায়ালা আমাকে মাফ করে দিন। এরপর তিনি মিসতাহকে আগে যেভাবে খরচ পত্র দিতেন তা দেয়া আবার চালু করলেন এবং বললেন, না-না, আমি তাকে সাহায্য দেয়া আর কখনাে বন্ধ করবাে না।
আয়শা(রা.) বলেন, রসূল(স.) যায়নাব বিনতে জাহাশের কাছে আমার ব্যাপারে জিজ্ঞাসা করলেন, বললেন, 'হে যয়নাব, তুমি কী জেনেছে, আর তুমি কী দেখেছে? তখন সে বললাে, 'ইয়া রসূলাল্লাহ, আমি আমার কান ও চোখকে সর্বদা বাঁচিয়ে চলি, আল্লাহর কসম, আমি তার সম্পর্কে ভালাে ছাড়া মন্দ কিছুই জানি না (অথচ একমাত্র সে-ই রূপ সৌন্দর্যে, নবী(স.)-এর সকল স্ত্রীদের মধ্যেও আমার প্রতিদ্বন্দী ছিলাে)। অতপর আল্লাহভীতি ও পরহেযগারীর কারণে আল্লাহ তায়ালা তাকে বাঁচালেন।
রেওয়ায়াতকারী বলছেন, অতপর আয়শা(রা.) বললেন, এরপর এ ব্যাপার নিয়ে যায়নাবের বােন তার সাথে ঝগড়া শুরু করে দিল, 'হতভাগা, আয়শার ওপরে ওঠার একটা মােক্ষম সুযােগ পেয়েছিলি, তুই এ সুযােগটা হেলায় হারালি। যাই হােক মিথ্যা অপবাদ রটনাকারীদের মধ্যে যার ভাগ্য খারাপ ছিলাে, সেই ক্ষতিগ্রস্ত হলাে।(ইবনে শিহাব বলেন, সে রচনাকারী দলের খবর এতােটুকু পর্যন্ত আমাদের কাছে পৌছেছে, এ হাদীসটি যুহরীর উদ্ধৃতিসহ বােখারী ও মুসলিমে বর্ণিত হয়েছে।
ইবনে এসহাকও যুহরী থেকে সামান্য শব্দের হেরফের সহ এভাবে হাদীসটি বর্ণনা করেছেন) *অপবাদের ঘটনাটির পর্যালোচনা : এভাবেই শ্বাসরূদ্ধকর অবস্থায় দীর্ঘ একটি মাস ধরে রসূল(স.) ও তার বাড়ীর লােকেরা জীবন যাপন করেছেন, জীবন যাপন করেছেন আবু বকর(রা.) এবং তার গৃহবাসীরা, এই কঠিন অবস্থায় জীবন কাটিয়েছেন সাফাওয়ান এবনে মােয়াত্তাল ও তৎকালীন সকল মুসলমানেরা।
সে মিথ্যা বানােয়াট ও সম্পূর্ণ কাল্পনিক এক ঘটনাকে কেন্দ্র করে তাদের জীবনে কী নিদারুণ ও দুঃসহ জ্বালা টেনে আনা হয়েছিলাে আর মাসাধিককাল ধরে মা আয়শার বেদনা-বিধুর চেহারা যখন কেউ কল্পনা নেত্রে দেখতে থাকে তখন যে কোনাে পাষাণ হৃদয়ও বিগলিত হয়ে হাহাকার করে ওঠে; প্রশ্ন জাগে কেন এমন হলাে, কেন আল্লাহ সােবহানাহু তায়ালা তাঁর রসূলকে নিয়ে এমন করুণ নাটকের অবতারণা করলেন যে, তার পনের ষােল বছর বয়সের এই প্রিয় স্ত্রীর কপালে এমন কলংক কালিমা অংকিত হলাে! কেন এই ক্ষীণদেহী, আবেগময়ী, লাজুক অল্প বয়সী মেয়েটির ওপর এতাে হৃদয়হীনভাবে, এমন কদর্য কাদা ছােড়া হলাে কি বীভৎস আনন্দে মেতে উঠলাে মােনাফেক নরপশুর দল যে নিছক মিথ্যা কল্পনার ওপর ভর করে তারা ফুলের মতাে নির্মল কোমল শতদলের ওপর এমন নিষ্ঠুর কষাঘাত হানলাে! কে এই নমনীয় কমনীয়, নিষ্পাপ-নিরপরাধ নাযুক রমনী, যার ওপর এমন কঠিন অশনিপাত হলাে? হাঁ, তিনি সেই মহীয়সী-পবিত্র পরিচ্ছন্ন নারী যার পবিত্রতা ঘােষণায় আল কোরআনের আয়াত নাযিল হয়েছে। যার দোষ মুক্তির কথা বলতে গিয়ে এবং নিষ্কলুষ অন্তরের কথা জানাতে গিয়ে এবং তার চিন্তাধারার পরিচ্ছন্নতার সাক্ষ্য দিতে আল্লাহ তায়ালা নিজেই তার কালাম নাযিল করেছেন।
এহেন সম্ভ্রমশীল মানুষের ইযযতের ওপর ইচ্ছাকৃতভাবে হামলা করা হয়েছিলাে, তার সম্ভ্রমের ওপর কটাক্ষপাত করা হয়েছিলাে, অথচ মােনাফেক দল চিন্তা করেনি যে, তিনি কার মেয়ে, কার স্ত্রী এবং কার আমানত। হতভাগারা একটুও হিসাব করলাে না যে তিনি সিদ্দীকে আকবার তনয়া লালিত পালিত এমন এক পবিত্র পরিচ্ছন্ন মর্যাদাবান পরিবারের মেয়ে যার তুলনা বিরল। তিনি নবী(স.)-এর ঘরের বাতি হিসাবে যে আমানত রক্ষা করার দায়িত্ব পেয়েছিলেন তার ওপর হামলা করা হল।
তিনি বনী হাশেম কুল শিরমনি মােহাম্মদ ইবনে আবদুল্লাহ, শেষ নবী ও রাসূল(স.)-এর স্ত্রী। তার গৌরব ও আত্মমর্যাদাবোধ কতো অধিক ছিলাে তা দুনিয়ার সাধারণ কীটরা কি করে বুঝবে। তার বিশ্বস্ততার ওপর এ হৃদয়হীন হামলা যারা করলাে, তারা কি একটু হিসাব করলাে না যে বিশ্বের সেরা মানুষ, সর্বাধিক গুণান্বিত মানুষ সব থেকে সুন্দর ও পবিত্র মানুষের হৃদয়ের রাণী, সরাসরি আল্লাহর ইশারায় যার বিয়ে হয়েছিলাে।
তার ওপর হামলা করা হয়েছে, এরপর হামলা করা হয়েছে তার ঈমানের ওপর, তিনি পরিপূর্ণ এক মুসলমান পুরোপুরিভাবে আল্লাহর আত্মসমর্পণকারিনী, যার লালন পালন হয়েছিলাে ইসলামের সৃতিকাগৃহে সেখানেই তার জীবনের প্রথম চোখ খােলে, আর সর্বোপরি তিনি রসূল(স.)-এর জীবন সংগিনী। হাঁ, এই ময়ীয়সী মহিলার ওপর দুর্নামের তীক্ষ্ণ তীর নিক্ষেপ করা হলাে।
তিনি পবিত্রতার তিলােত্তমা, তিনি সরলা বালিকা, কোনাে ঝঞ্ঝাট ঝামেলা তাকে কখনাে জড়াতে পারেনি, তার কোনাে উচ্চাশাও ছিলাে না, সুতরাং আল্লাহর কাছে চাওয়া পাওয়া ছাড়া তার জীবনের আর কোনাে স্বপ্নই ছিলাে না, আর এতদসত্ত্বেও অন্য কোনাে বড় আশা না করে তিনি শুধু অপেক্ষায় ছিলেন যে অবশ্যই স্বপ্নের মধ্যে রসূল(স.) তার পবিত্রতা সম্পর্কে এমন কিছু দেখবেন, যার দ্বারা তার প্রতি যেসব কথা নিক্ষেপ করা হয়েছে তার থেকে তিনি মুক্তি পাবেন, কিন্তু এ সময়ে দীর্ঘ এক মাসব্যাপী ওহী আসা বন্ধ থাকা অবশ্যই ছিলাে আল্লাহরই এক বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ পরিকল্পনা, যা তার নিজেরই ইচ্ছায় তৈরী হয়েছিলাে, অর্থাৎ আল্লাহর নিজস্ব অভিপ্রায়েই মাসাধিককাল পর্যন্ত ওহী পাঠানাে হয়নি।
আসলে এটাও ছিলাে আর এক প্রকার কঠিন অবস্থা, যা সে বদনাম করার শাস্তি থেকে কোনাে অংশে কম নয়। কিন্তু হায় আল্লাহ তায়ালা, তিনি একি শুনলেন উম্মে মিসতাহের কাছে! এ যে এক বজ্রাঘাত সম বিধল তার বুকে। একে তাে মাসাধিকাল ধরে অসুস্থ থাকায় দেহ মন তার অবসন্ন, জ্বরের উত্তাপে শরীর পুড়ে যাচ্ছে, মাথার যন্ত্রণায় তিনি অস্থিরভাবে কাতরাচ্ছেন তারপর এ দুঃসংবাদ এসে শেলের মতাে বিধল তার কুসুম কোমল হৃদয়ে রােগক্লিষ্ট দেহে, ব্যথা জর্জরিত হৃদয়ে এবং অবর্ণনীয় কাতর কণ্ঠে চরম বিস্ময়ভরে তিনি মাকে বলছেন, সােবহানাল্লাহ! মানুষ সত্যই কি এসব কথা বলাবলি করছে? (আশ্চর্য হবার নয়? এরা তাে সেই মানুষ যারা রসূল(স.)-এর জন্যে জীবন দিতে প্রস্তুত!) অপর এক বর্ণনায় বলা হয়েছে তিনি বলে উঠলেন, আমার আব্বা কি একথা জানতে পেরেছেন? আহা, আমার আব্বা নিজেকে কতাে বড় ভাগ্যবান ভাবেন, আল্লাহর রসূল(স.)-কে জামাই বানাতে পেরে, নিজের কলিজার টুকরা, আদরের দুলালী এই কচি মেয়েটাকে তার হাতে তুলে দিতে পেরে কতাে গৌরবান্বিত তিনি।
তিনি কিভাবে সহ্য করবেন এ দুঃসহ জ্বালা তখন তার মা উত্তর দিচ্ছেন, হাঁ, মা। তারপর আবার মা আয়শা জিজ্ঞাসা করছেন, আর রসূল(স.)ও আল্লাহর রসূল, তিনি তাে শুধু স্বামী নন, তিনি দুনিয়া জাহানের মালিক আল্লাহর পরম প্রিয় রসূল, সারা জাহানের মধ্যে শ্রেষ্ঠ মানুষ কতাে গভীরভাবে তিনি তাকে ভালােবাসেন! হায়, তিনি জেনে থাকলে তার হৃদয়ে কী প্রতিক্রিয়া হয়েছে! একথার জবাবেও অসহায়ভাবে মা বললেন, হা হায় আল্লাহ! কি দুঃখ নেমে এলাে তার ভাগ্যে, কি দুঃখ যাতনা নেমে এলো আল্লাহর রাসূলের জীবনে! এদিকে নবীজীর কথাটাই ভাবুন, তিনি তাে সেই নবী, সেই মহা মানব, যাকে তিনি নবী বলে জেনেছেন, মেনেছেন, যার হাতে তার জান-মন-প্রাণ সবই অম্লান বদনে সপে দিয়েছেন, তিনি তাকে সম্বােধন করছেন, ব্যথাহত হৃদয়ে ও ভাংগা গলায় তিনি তাকে বলছেন, তাহলে এখন শােনাে, আমার কানে এই কথা পৌছেছে, এখন তুমি যদি নির্দোষ থেকে থাকো, শীঘ্রই আল্লাহ তায়ালা তােমার দোষ মুক্তির খবর জানাবেন, আর (মানবী তুমি, শয়তানের ষড়যন্ত্রে যদি কোনাে দুর্ঘটনা ঘটে থাকে) যদি কোনাে অপরাধে জড়িত হয়ে থাকো, ক্ষমা চাও মহান আল্লাহর দরবারে এবং তার কাছেই তাওবা করাে, যখন মানুষ দোষ ত্রুটি করে তা স্বীকার করে এবং আল্লাহ রব্বুল আলামীন-এর কাছে তাওবা করে (অনুতপ্ত হৃদয়ে তার কাছেই ফিরে যায় এবং আর এ ধরনের অপরাধ করবে না বলে সর্বান্তকরণে ওয়াদা করে) তিনি অবশ্যই সে তাওবা কবুল করেন। এতদশ্রবণে আয়শা সিদ্দীকা(রা.) বুঝলেন তিনি (নবী স.) ও এসব খবরে কিছু সন্দিহান হয়েছেন, (আল্লাহ তায়ালা তাকে, নবী বানানাের সাথে সাথে মানুষও তাে বানিয়েছেন, সুতরাং এতোসব গুজবে তার মনে কিছু সন্দেহ জাগাটা মােটেও অস্বাভাবিক কিছু নয়)। তার পবিত্র থাকার ব্যাপারে (এই মুহূর্তে) তিনি পুরােপুরি নিশ্চিন্ত নন, এবং তার ওপর অপবাদের জন্যে তিনি সে সংশ্লিষ্ট লােকদের জন্যে কোন শান্তি ঘােষণা করেননি।
তার রবও এই রটনা চলাকালীন দীর্ঘ এতােটা | সময়ের মধ্যে বা পরে তাকে কিছু জানালেন না, আর তিনি (রসূল স.) ও তার দোষ মুক্তির কথা খুলে বলেননি, অথচ আয়িশা নিজে তাকে তার নিরপরাধ হওয়ার ব্যাপারে সম্যক অবগত, কিন্তু এটা প্রমাণ করার কোনাে ক্ষমতাই তার নেই, এজন্য তিনি অপবাদের বােঝা ঘাড়ে হা হুতাশ করে সকাল সন্ধা কাটাচ্ছেন এবং হায়, সে মহান হৃদয়বান ব্যক্তি, যিনি তাকে কতো ভালােবাসেন, তাঁর কাছেও আজ এক অপবাদগ্রস্ত মানুষ বলে তিনি বিবেচিত।
হায়, এমনই এক কঠিন মুহূর্তে দুঃখের সাগরে ভাসতে থাকাটাই তার জন্যে বরাদ্দ হয়ে গেছে। এরপর, দেখুন কি অবস্থা সে মহান ব্যক্তি আবু বকর সিদ্দীকের তার ব্যক্তিত্ব, তার সামাজিক মর্যাদা, তার ব্যক্তিগত দৃষ্টান্তমূলক পরহেযগারী এসব সহ দুঃসহ ব্যথার দংশনে তিনি জর্জরিত, তার মান-সম্ভ্রমের ওপর এ যে এক প্রচন্ড আঘাত, মােহাম্মদ (স.)-এর স্ত্রী- তার কন্যার ওপর এই রটনা, জামাই, তিনি কি শুধু জামাই তিনি তার পরম প্রিয় বন্ধু, যিনি তাকে কতাে ভালােবাসেন, তিনিও হৃদয় মন দিয়ে সে মহামানবকে ভালবাসেন, এ পবিত্র ভালবাসার ওপর একি অশনিপাত। তিনি তাে শুধু পরম প্রিয় বন্ধুই নন, তিনি যে আল্লাহর সেই মহান নবী, যাকে তিনি সর্বান্তকরণে বিশ্বাস করেছেন, যাকে তার হৃদয়ের সকল আবেগ দিয়ে সত্য বলে জেনেছেন, যার জন্যে তিনি বাইরের কোনাে প্রমাণের অপেক্ষা করেননি, হায়, তাঁর কথাতেও তার মর্মব্যথা কী নিদারুণভাবে পরিস্ফুট এই প্রচন্ড ব্যথার দুঃসহ জ্বালায় কত ধৈর্যশীল তিনি কত কঠিনভাবে তিনি আত্মসমালােচনায় ব্রতী।
এমনই মানসিক পেরেশানীর মধ্যে তিনি স্বগতােক্তি করছেন, বলছেন, হায় আল্লাহর কসম জাহেলিয়াতের আমলেও তাে কেউ এমন বদনাম দিতে পারেনি। আজ ইসলাম গ্রহণ করার পর নিছক কল্পনা করে আমার পরিবারের ওপর এমন দুর্ণাম রটানাে হলাে এতাে এমন এক কথা যা অনবরত যেন মাথার ওপর আঘাতের ওপর আঘাত হেনে চলেছে, এমনই এক কঠিন সময় তার কলিজার টুকরা অসুস্থ রুগ্ন মেয়েটি, মর্মজ্বালায় দিবানিশি যার ঘুম হারাম হয়ে গেছে সে তাকে নবী(স.)-এর কথার উত্তর দিতে বলছে। কী বলবেন তিনি, হৃদয় তার শুকিয়ে গেছে, ভাষা তার গতিপথ হারিয়ে ফেলেছে, বুদ্ধি তার কাজ করছে না, ডুকরে কেদে উঠে তিনি শ্রান্তক্লান্তভাবে বারবার বলছেন, আল্লাহর কসম, আমি জানি না, রসূল(স.) কে আমি কী বলবাে! এরপর দেখুন সিদ্দীকে আকবারের স্ত্রী উম্মে রূমানের অবস্থা। তিনি এই দুঃখজর্জরিত অসুস্থ কন্যার সামনে সব কিছু ব্যাপারেই অত্যন্ত দৃঢ়তা দেখাচ্ছিলেন সত্য, কিন্তু যখন তার মনে হচ্ছিলাে, নির্মল মেয়েটা যেভাবে অনবরত রাত দিন কেঁদে চলেছে তাতে যে কোনাে সময় সে হার্ট ফেল করবে বা তার কলিজা ফেটে যাবে এমনই এক নাযুক মুহূর্তে তাকে তিনি বলছেন, মা- আমার ওপর একটু দয়া করাে, ব্যাপারটাকে এভাবে সহজ করে দেখাে, 'আল্লাহর কসম, পৃথিবীর এমন দৃষ্টান্ত বহু আছে, যখনই কোনাে নারী তার স্বামীর কাছে বিশেষভাবে আদর মহব্বত পেয়েছে এবং তােমার মতাে এমন ভাগ্যবান হয়েছে, উপরন্তু যদি তার কয়েকজন সতীন থেকেছে, সে অবস্থায় তাদের পক্ষে সহ্য করা মুশকিল হয়ে গেছে, তারা অবশ্যই বাড়াবাড়ি করে বসেছে।
কিন্তু এ দৃঢ়তা এবং এ ধৈর্য্য তিনি সেই মুহূর্তে আর ধরে রাখতে পারলেন না যখন আয়শা(রা.) বললেন, মা রসূল(স.)-এর কথার জওয়াব দিন না! তখন তিনি কাতর কণ্ঠে বললেন সেই একই কথা যা যা তার স্বামী একটু আগে বলেছিলেন, আল্লাহর কসম, আমি বুঝতে পারছি না, কি বলবাে আমি রাসূল(স.) কে কী বলবাে। অপরদিকে, আর এক ব্যক্তি, সাফওয়ান ইবনে মােয়াত্তাল- হায়, তাকে দোষ দেয়া হয়েছে তার নবীর স্ত্রীরূপ আমানতের খেয়ানত করার, ইসলাম গ্রহণ করার পর, রব্বুল আলামীনের কাছে নিজেকে যখন পরিপূর্ণভাবে সােপর্দ করে দিয়েছেন, তারপর তাকে অপবাদ দেয়া হচ্ছে, তার আমনতদারীর ওপর আঘাত হানা হচ্ছে, তার মর্যাদা, তার আভিজাত্য বােধ এবং যে সব মহৎ গুণের কারণে একজন সাহাবাকে সম্মানিত করা হয় সেসব কিছুর ওপর চরমভাবে আঘাত হানা হচ্ছে, অথচ এসব কিছুর উর্ধে ছিলাে তার চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য, তাকে জড়িয়ে এই মারাত্মক যে অপবাদ রটানাে হয়েছিলাে সে কথা হঠাৎ করে তিনি জানতে পারলেন, অথচ এমনই আল্লাহভীরু চরিত্রের অধিকারী তিনি ছিলেন যে তার কল্পনাতেও এমন মারাত্মক কথা কখনাে স্থান পায়নি। আচ্ছা, আমরা একটু চিন্তা করে দেখি, ওপরে যে পরিস্থিতিতে তিনি তার উটটি বসিয়ে আয়শা(রা.)-কে তার ওপরে বসালেন এবং নিজে রশি ধরে এগিয়ে গিয়ে মূল কাফেলার সাথে মিলিত হলেন, সে অবস্থায় তিনি এর বাইরে আর কী করতে পারতেন? তাছাড়া যে ইসলামী দলটা আল্লাহভীতির ভিত্তিতে গড়ে উঠেছিলাে, আল্লাহর ভয়ে নিয়ন্ত্রিত হতে যাদের গােটা জীবন, আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের জন্যে যারা জীবন উৎসর্গ করার ভুরী ভুরী দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন, যারা নবী(স.)-এর নিরাপত্তার জন্যে নিজেদের বুককে ঢাল বানিয়ে দিয়েছেন সেই মহা পুণ্যবান মানুষদের সম্পর্কে এমন জঘন্য চিন্তা করতে পারে একমাত্র তারা যাদের অন্তর চরমভাবে ব্যাধিগ্রস্ত। এ অপবাদের কথা কানে আসার সাথে সাথে তার (সাফওয়ানের) মুখ দিয়ে উচ্চারিত হলো, সােবহানাল্লাহ! 'কোনো মেয়ের রানের কাপড় আমি কোনােদিন সরাইনি।
এসময় যখন তিনি জানতে পারলেন যে তার সম্পর্কে হাসসান ইবনে সাবেত এই অপবাদ ছড়িয়েছে, তখন তিনি নিজেকে আর নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারছিলেন না এবং তরবারি দ্বারা তার গর্দান উড়িয়ে দেয়ার জন্যে এগিয়ে গিয়েছিলেন, এমন সময়, তার মনে পড়লাে, একজন মুসলমানকে তরবারি দিয়ে আঘাত করা নিষিদ্ধ, এ চিন্তা তাকে থামিয়ে দিলাে বটে, কিন্তু অপবাদের বেদনা তিনি সহ্য করতে পারছিলেন না, তার ধৈর্যের বাধ ভেংগে যাচ্ছে। তারপর দেখুন আল্লাহর রসূল(স.)-এর দিকে। তিনি আল্লাহর রসূল, তিনি বনু হাশেম গোত্রের শিরমনি, আল আমীন, মক্কা মদীনার নয়নমনি, বিশ্বের সেরা মানুষ, মানব কুলের গৌরব, মানুষের ব্যথায় সদা উদ্বেলিত যার কুসুম কোমল হৃদয়, অবহেলিত, নিপীড়িত, দুঃখ-জর্জরিত মানবতার সমস্যা সমাধানে ও দুঃখ দুর্দশা দূরীকরণে এবং শত্রুতা বন্ধুতে রূপান্তরিত করার মানসে যিনি নিজ রূপ যৌবনের চাহিদা ভুলে গিয়ে অসম সকল বিবাহ বন্ধনে রাজি হয়েছেন, তার ঘরেই প্রবেশ করলাে এই নিষ্ঠুর অপবাদের দুঃখজনক তুফান! নবী হলেও তিনি তাে মানুষ, মানুষের অনুভূতি ও দুঃখ বেদনা দিয়েই তাে মানুষের মাঝে তাকে পাঠানাে হয়েছে এবং এভাবে মানুষের দরদ ব্যথা বুঝার ক্ষমতা তাকে দেয়া হয়েছে, কাজেই ওসামার কথাতেই সুস্পষ্টভাবে প্রকাশ পেয়েছে তার কঠিন মানসিক পেরেশানী এবং ঘরের কাজের মেয়ের সাক্ষ্য দ্বারা আরাে জোরালােভাবে বুঝা গেছে আল্লাহর পরম বন্ধুর উদ্বেগ উৎকণ্ঠা যা মসজিদে উপস্থিত গােটা মুসল্লিরা গভীরভাবে আঁচ করেছে, ফলে, যারা রসূল(স.)-এর অমর্যাদা করেছে, যারা তার পরিবারের মর্যাদাবান সাহাবীদের অন্যতম যার চাল চলন সম্পর্কে কেউ কোনাে দিন খারাপ কিছু দেখেনি।
তাদের গোত্রের লােকজন এবং তাদের আত্মীয় স্বজন তাদের জন্যে ওযরখাহী করেছে, রসূল(স.)-এর কাছে তাদের পক্ষে মাফ চেয়েছে এবং সে হতভাগাদের ভীষণভাবে নিন্দা করেছে, যার কিছু দৃশ্য ইতিমধ্যেই আমরা মসজিদে নববীতে এবং নবী(স.)-এর উপস্থিতিতে আওস ও খাযরাজ গােত্রদবয়ের রূখারুখির মধ্য দিয়ে দেখতে পেয়েছি।
মুসলমানদের এই প্রধান মিলনকেন্দ্র সাহাবাদের সহযােগিতায় রাসূল(স.)-এর নিজ হাতে তৈরী মসজিদে খুনােখুনী হয়ে যাওয়ার উপক্রম একথারই সাক্ষ্য বহন করে যে এ অপবাদ রটনার ব্যাপারটা গােটা মুসলিম সমাজকে কিভাবে ঝাঁকিয়ে তুলেছিলাে, কতােবড় ফাটল ধরিয়েছিলাে মুসলিম জামায়াতের নেতৃত্বের মধ্যে! বিশেষ করে জামায়াতের এই দ্বিধা-বিভক্তিই রসূল(স.)-এর হৃদয়কে বেশী বিদীর্ণ করেছিলাে-আর সত্য যে মহান বাতি প্রদীপ্ত হয়েছিলাে মােমেনদের অন্তরসমূহের মধ্যে তার প্রভা যেন ম্লান হয়ে গেছে বলে মনে হচ্ছিল, মনে হচ্ছিলাে সে সমুজ্জ্বল আলাে মানুষকে আর পথ দেখাতে পারছে না।
জলদিই এর অবসান হওয়া দরকার এ জটিল সমস্যার আশু সমাধান নিতান্ত প্রয়ােজন। সুতরাং কালবিলম্ব না। তিনি সিদ্ধান্ত নিলেন আয়েশার কাছে যেতে হবে এবং ছাফ ছাফ আলাপ-আলােচনা করে শীঘ্রই একটা সমাধানে পৌছুতে হবে (যারা আমরা এ অধ্যায়টি পড়ছি তারা অবশ্যই বুঝতে পারছি আল্লাহর রসূল(স.) যে সব প্রস্তাব করলেন তার মধ্যে ভাঙ্গন-বিপর্যয় রােধ করার সকল মাল-মশলা ও প্রস্তুতি বর্তমান ছিলাে, ভাংগন কোনাে অবস্থাতেই নয়, যা শয়তানের প্রধান কাম্য।)
আল্লাহর রাজ্যে সকল সমস্যারই সংশােধনী আছে যদি তাতে ভুল স্বীকার, অনুতাপ ও সংশােধনী মনােবৃত্তি, থাকে হতাশার ইন্ধন না থাকে। দেখুন নবী করীম(স.) আবার ওই কথাটি সুস্পষ্ট করতে বুঝতে যাচ্ছেন যা মানুষ বলছে। আর তিনি তার (আয়শার) কাছ থেকেই তৃপ্তিজনক কথা, চাইছেন যা তাঁর নিদারুণ দুঃখজ্বালা নিবারণ করতে পারে, মানসিক প্রশান্তি ফিরিয়ে আনতে পারে।
আর এমনই এক পর্যায়ে, যখন ব্যথা বেদনা, দুঃখ-জ্বালা, মানসিক যন্ত্রণা সকল ধরনের পেরেশানী চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌছে গেলাে এবং তাতে অত্যন্ত মর্মান্তিকভাবে জড়িত হয়ে পড়লাে। ব্যক্তি, পরিবার ও গােটা মুসলিম সমাজ তথনই আল্লাহ রব্বুল আলামীন তাঁর নবীর ওপর মহব্বতের দৃষ্টি দান করলেন এবং সকল অস্পষ্টতার অবসান ঘটিয়ে তার অমিয়বাণী নাযিল করলেন, দুঃখের ঘনঘটা দূরীভূত হলো আয়শা সিদ্দিকা তাহেরা(রা.)-এর পবিত্রতা ঘােষণা করে আল কোরআন নাযিল হলাে, নবী(স.)-এর মহান পবিত্র মর্যাদা ঘােষিত হলাে, সেসব মােনাফেকদের খােলস খুলে দেয়া হলাে যারা অপবাদের এই নাটক রচনা করেছিলাে এবং এই মহাসম্মানিত নবী(স.)-এর পক্ষে মুসলমানদের জন্যে সরল সুন্দর ও বলিষ্ঠভাবে মােকাবেলার পথ খুলে দেয়া হলাে।
এই আয়াত যখন নাযিল হল তখন আয়িশা(রা.) বলে উঠেছিলেন, 'আল্লাহর কসম, আমি তাে তখনই জানতাম (যে যা-ই বলুক না কেন), আমি অবশ্যই দোষমুক্ত এবং আল্লাহ সােবহানাহ তায়ালা অবশ্যই আমার দোষমুক্তির ঘােষণা দেবেন, কিন্তু আল্লাহর কসম এটাও সত্য, আমি কস্মিনকালেও ধারণা করতে পারিনি যে, আল্লাহ তায়ালা আমার জন্যে ওহী নাযিল করবেন এবং তা মানুষের মুখে মুখে পঠিত হতে থাকবে।
আর আমি তাে নিজেকে আমার কাছে এতােই তুচ্ছ মনে করি যে আমার যে, কল্পনাতেও আসে না যে আমার সম্পর্কে আল্লাহ তায়ালা কথা বলবেন এবং তা মানুষ পড়বে, বরং আমি এতােটুকু মাত্র আশা করছিলাম যে রসূলুল্লাহ ঘুমের মধ্যে স্বপ্ন দেখবেন যে, আমাকে দোষমুক্ত করা হচ্ছে।
কিন্তু ঘটনার অবতারণা যেভাবে হয়েছে, তাতে ঘটনাটা শুধু ব্যক্তি আয়িশা(রা.)-কে নিয়েই সীমাবদ্ধ থাকেনি, ব্যাপারটা তাে রসূলুল্লাহ(স.)-এর ব্যক্তিত্বকে জড়িয়ে মুসলিম দলের মধ্যে তাঁর কর্তব্য পালনের দায়িত্বকে চ্যালেঞ্জ করা নিয়ে সংঘটিত হয়েছে, বরং আরও এক ধাপ এগিয়ে বলা যায় যে আল্লাহর সাথে তার যে সম্পর্ক বিদ্যমান সেটাকেও ধ্বংস করার হীন চক্রান্ত করা হয়েছে।
আর আয়শা(রা.)-এর চরিত্রের ওপর কলংক লেপন দ্বারা একমাত্র তাকেই যে কলংকিত করা হয়েছে তা নয়, এ কলংক তাে ছিলাে নবী(স.)-এর আকীদার ওপর। আল্লাহ তায়ালা সব কিছুর মালিক এবং সকল ক্ষমতার অধিকারী একমাত্র তিনি এবং সকল কিছু তিনিই নিয়ন্ত্রণ করেন, তাঁর ইচ্ছার বিরুদ্ধে এবং তার জ্ঞানের বাইরে বিশ্ব জাহানের কোথাও কিছু সংঘটিত হতে পারে না। এ আকীদা যে গ্রহণ করেছে সে প্রকাশ্য ও গােপনে জীবনের শুদ্ধি রক্ষা করে চলে, আল্লাহ তায়ালাই তাকে নিয়ন্ত্রণ করেন, তার প্রতিনিধির জান মাল ও ইযযতের যামীন সর্বশক্তিমান আল্লাহ তায়ালা নিজেই।
ইচ্ছা করলেও তার পরিবারের কেউ ক্ষতি করতে পারে না- শয়তানের যাবতীয় ষড়যন্ত্র সেখানে ব্যর্থ হতে বাধ্য এই মৌলিক আকীদার ওপরও ছিলো এ প্রচন্ড আঘাত! এ জন্যেই অবশেষে আল্লাহ রব্বুল আলামীন আল কোরআন নাযিল করলেন যাতে বিস্তারিতভাবে সে বিষয়টি মানুষের কাছে জানাজানি হয়ে যায় এবং ভবিষ্যতের মানুষ যেন আল্লাহর শক্তি ক্ষমতার ওপর তৃপ্তি সহকারে আত্মসমপর্ণ করে শয়তানের ষড়যন্ত্র থেকে দূরে থাকতে পারে; ইসলাম বিরােধী আল্লাহবিরােধী ও রসূল বিরোধী যে কোনাে তৎপরতা মােকাবেলা করতে পারে এবং আল্লাহর মহা বিস্ময়কর জ্ঞানের সুপ্রশস্ত দরজা খুলে যায়, যেখানে মানুষ বুঝতে পারে যে আল্লাহ তায়ালা ছাড়া কেউ কিছুই জানে না, কিছুই করতে পারে না, তাই এরশাদ হচ্ছে, 'নিশ্চয়ই যারা নিয়ে এলো এই অপবাদের ঘটনাটি, তারা তােমাদের মধ্য থেকে বিপথগামী।
পথভ্রষ্ট একটি দল... বরং এটা তােমাদের জন্যে সকল দিক দিয়েই কল্যাণকর... ওদের মধ্যে প্রত্যেক ব্যক্তির জন্যেই রয়েছে সেই পাপের শাস্তি যা সে অর্জন করেছে, আর ওদের মধ্যে প্রধানত যে ব্যক্তি এ বিষয়টা পরিচালনা করেছে তার জন্যে রয়েছে বিরাট আযাব। *মােনাফেকদের ধ্বংসাত্মক যড়যন্ত্রের পরিণতি : ওপরের আয়াতটি দ্বারা বুঝা যাচ্ছে যে মিথ্যা অপবাদ রটনাকারীরা কোনাে একজন ব্যক্তি বা কয়েকজন ব্যক্তির সমষ্টি মাত্র নয়, বরং তারা হচ্ছে এক বিশেষ উদ্দেশ্যে সংগঠিত একটি দল এতে জড়িত শুধু একা আবদুল্লাহ ইবনে উবাই ইবনে সালুলই নয়, হাঁ, সে-ই এই কুচক্রী দলের প্রধান, সে-ই গােটা মুসলিম সংগঠন ও জনশক্তিকে ভেংগে চুরমার করে দেয়ার জন্যে ষড়যন্ত্র করেছিলাে, সে-ই পারস্পরিক অবিশ্বাস সৃষ্টি করার জন্যে আল্লাহর পেয়ারা এ নবগঠিত ও সুসংহত দলটির মধ্যে বিভেদ সৃষ্টি করতে চেয়েছিলাে, পরস্পরের মধ্যে হিংসা বিদ্বেষ ও ভুল বুঝাবুঝি সৃষ্টি করে এবং একের বিরুদ্ধে অপরকে লেলিয়ে দিয়ে গােটা মুসলিম জাতিকে বিপর্যস্ত করতে।
চেয়েছিলাে- এরা হচ্ছে সে জনগােষ্ঠী যারা প্রকাশ্য যুদ্ধে মুসলমানদেরকে হারাতে না পেরে গোপনে এক মাসের মধ্যেই এই মহা পরিকল্পনা তৈরী করে ফেলেছিলাে, পর্দার আড়ালে থেকে তারা নিষ্ঠাবান মুসলমানদের কয়েকজনকে কাজে লাগিয়ে ছিলাে, বিশেষ করে নবী(স.)-এর আস্থাভাজন ও একান্ত কাছাকাছি মানুষদেরকেও কাজে লাগানাের ব্যর্থ চেষ্টা করতেও তারা কসুর করেনি, অবশ্য মিথ্যা অপবাদ রটনার এই ঘটনাটি ছিলাে ইসলামকে ধ্বংস করার চক্রান্তসমূহের মধ্যে এক বিরাট ধ্বংসাত্মক ষড়যন্ত্র, তারা ইসলামের মূল কেন্দ্র স্বয়ং নবীর ঘরেই আগুন ধরিয়ে দিয়েছিলাে।
যে মহান ব্যক্তির পরিচালনায় বিশ্বব্যাপী ইসলামের চূড়ান্ত অভিযান পরিচালিত হচ্ছিলাে সেই মহা বিপ্লবী বীরকে হতবিহ্বল করার উদ্দেশ্যে তাঁর হৃদয়কে ভেংগে চুরমার করে দিতে চেয়েছিলাে তারা! দেখুন না কেমন করে রসূল(স.)-এর একান্ত ঘরের মানুষ হামনা বিনতে জাহশ, তার বিশ্বস্ত সহচর ও গুণ মুগ্ধ কবি হাসসান বিন সাবেত, তার নিজ গােষ্ঠীর মানুষ বদরী সাহাবী মিসতাহ ইবনে আসাসা প্রমুখ ব্যক্তিকে সে এই ঘৃণ্য ষড়যন্ত্রের সাথে জড়িয়ে ফেলেছিলাে, যার জন্যে তারা এটা-ওটা দায়িত্বহীন মন্তব্য করে বসেছিলাে, কিন্তু মূল যড়যন্ত্রের হোতা ছিলাে মােনাফেক সর্দার আবদুল্লাহ ইবনে উবাই নিজে, যার নেতৃত্বে পরিচালিত হচ্ছিলাে এক সংঘবদ্ধ কুচক্রী দল, সে প্রকাশ্য দৃশ্যে না এসে পর্দার আড়ালে থেকে এমন নিপুণভাবে তার হৃতরাজ্য হারানাের প্রতিশােধ নিতে চাইছিলাে যে তাকে কিছুতেই ধরা যাচ্ছিলাে না।
প্রকাশ্যে এমন কোনাে কথা তার মুখ দিয়ে বেরােয়ানি যার দ্বারা তার দোষ প্রমাণিত হতে পারে এবং তাকে পাকড়াও করা যায়। এই ভয়ংকর মােনাফেক সর্দার তার একান্ত বিশ্বস্ত বন্ধু পরিবার পরিজন ও পারিষদের সাথে গােপন পরামর্শের মাধ্যমে তার ঈপ্সিত চক্রান্ত জাল বিছিয়ে দিয়েছিলাে।
এ দলের ওপর তার পুরাে আস্থা ছিলাে এবং সে নিশ্চিন্ত ছিলাে যে এদের মধ্যে কেউ তার মুখােশ খুলে দেবে না, তার বিরুদ্ধে যাবে না বা কখনাে তার বিরুদ্ধে কোনাে সাক্ষ্যও দেবে না। এতে দক্ষতা ও কুট কৌশলের মাধ্যমে এই মহা মােনাফেক তার পরিকল্পনা তৈরী করেছিলাে যে পূর্ণ এক মাস ধরে গােটা মদীনা ব্যথা বেদনা ও মর্ম জালায় প্রকম্পিত হচ্ছিলাে, কারণ এই রটনার মাধ্যমে বড়ই মুখােরােচক এক কাহিনী মানুষের মুখে তুলে দেয়া গেছে, যার ফলে সাধারণভাবে এর চর্চা চলছে, আর এরই ফলে পবিত্রতম ও সব থেকে আল্লাহভীরু ঘরের পরিবেশকে বিষিয়ে তােলার মতাে এক মোক্ষম হাতিয়ার তাদের হস্তগত হয়ে গেছে।
এতােদিন ধরে হিংসার আগুনে জ্বলে পুড়ে মরছিলাে যে মহা কুচক্রী- তার জন্যে ছিলাে এ এক মহা বিজয়। এজন্যেই এই প্রসংগের আলােচনার শুরু হচ্ছে যাতে করে সে মহা ষড়যন্ত্রের রহস্য জাল ছিন্ন করা যায় এবং জানানাে যায় যে এর মূল শিকড় কোথায়, কতাে গভীরে তা লুকিয়ে আছে, আর যাতে তাও প্রকাশ করা যায় যে সে সংঘবদ্ধ কুচক্রী দল ইসলাম ও মুসলমানদের সর্বনাশ সাধনে কি বদ্ধপরিকর এবং তারা সূক্ষ্ম ও সুগভীর সন্তর্পণে এগিয়ে চলেছিলাে।
তারপর এ মহা চক্রান্তের পরিণাম জানাতে গিয়ে আল্লাহ রব্বুল আলামীন মুসলমানদেরকে পরিপূর্ণ নিশ্চয়তার সাথে জানাচ্ছেন যে চক্রান্তকারীরা যাই আশা করুক না কেন এবং যতাে ক্ষতি করার প্রয়াস পাক না কেন, ওরা তাদের কোনাে ক্ষতিই করতে পারবে না, বরং ওদের সমস্ত পরিকল্পনা বুমেরাং হয়ে ওদের ওপরেই ফিরে আসবে, তাই বলছেন, না, না, তােমরা ভেবাে না যে ওদের এসব চক্রান্ত তােমাদের জন্যে ক্ষতিকর বরং তােমাদের জন্যে এটা হবে সব দিক দিয়েই কল্যাণকর।'
কল্যাণকর, হাঁ অবশ্যই এভাবে এটা কল্যাণকর হবে যে, রসূলুল্লাহ(স.) এবং তার পরিবারের বিরুদ্ধে চক্রান্ত করার অজুহাতে সে কুচক্রীর যে প্রকৃতপক্ষে ইসলামের বিরুদ্ধেই দুশমনি করছিলাে আলােচ্য এ ঘটনার মাধ্যমে তা সুস্পষ্ট হয়ে উঠবে। আর মুসলমানদের জন্যে মিথ্যা রটনাকে সম্পূর্ণ হারাম ঘােষণা করা হয়েছে এবং অপবাদ দানকারীদের ওপর হদ জারী করা আল্লাহ তায়ালা ফরয ঘােষণা করেছেন, তিনি আরাে জানাচ্ছেন এ জঘন্য অপরাধের দ্বারা দলীয় জীবনের সংহতি বিনষ্ট হয়, কারণ এসব কথা যখন কানাকানি জানাজানি হতে থাকে তখন আমাদের মা-বােনেরাই বেশী ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
তাদেরকে আল্লাহ তায়ালা পয়দা করেছেন মায়া-মমতার প্রতীক হিসাবে, তাদের বিনয়-নম্রতা, শারীরিক নাযুকতা, হৃদয়াবেগ, কমনীয়তা-নমনীয়তা ও লাজুকতা সবই ভবিষ্যৎ বংশধরদের জন্যে। তাদের সেই সব গুণাবলী দ্বারাই যৌথ সংসার ও শান্তির পরিবার গড়ে ওঠে। তুচ্ছ কারণে বা নিছক সন্দেহের বশবর্তী হয়ে অথবা কোনাে পদস্খলের আঘাত সইতে না পেরে যদি সঠিক পন্থায় পরিশুদ্ধ করার পরিবর্তে আমরা যত্রতত্র ও এলােমেলাে সমালােচনার পথ গ্রহণ করি অথবা সহজভাবে এগুলােকে ছেড়ে দেই তাহলে সর্বনাশের কোনাে সীমা থাকবে না এবং সমাজ সংসার ধ্বংসের অতল তলে তলিয়ে যাবে।
এজন্যেই এ অপরাধকে ইসলাম অত্যন্ত কঠিন ও ধ্বংসাত্মক গণ্য করে এর জন্যে কঠোর শাস্তির ব্যবস্থা করেছে এবং জানিয়েছে যে, প্রকাশ্যে ও যথেষ্টসংখ্যক দর্শকদের সামনে, এ শাস্তি দিতে হবে যাতে এ অপরাধকে কেউ সহজ না ভাবে, নচেৎ এই অপবাদ দিতে গিয়ে কারাে কোনাে মান সম্ভ্রমের তােয়াক্কা করবে না, এ বদনাম দেয়া থেকে কাউকেই বাদ দেবে না, ফলে মানুষে মানুষকে ভালবাসি, কল্যাণকামিতা ও শ্রদ্ধাবােধ শেষ হয়ে যাবে- কোনাে লজ্জা শরম ও মানুষের প্রতি দরদ ব্যথা থাকবে না।
এই দুর্ঘটনা ঘটে যাওয়াটা উত্তম হয়েছে এজন্যে যে, এই উপলক্ষে এ ধরনের অপরাধের মােকাবেলা করার জন্যে মযবুত আইন করে দেয়া সম্ভব হয়েছে। এ ঘটনার কারণে রসূলুল্লাহ(স.) আহলে বায়ত রসূলুল্লাহ(স.)-এর পরিবার ও গোটা মুসলিম সমাজকে যে কঠিন ব্যথা-বেদনা সইতে হয়েছে, মাসাধিককাল ধরে যে দুঃসহ জ্বালা ভােগ করতে হয়েছে তা সবই এ বিষয়ক অভিজ্ঞতার চড়া মূল্য, কঠিন পরীক্ষার ফিস এবং বাধ্যতামূলক দেয় সংশােধনী বলেই বুঝতে হবে। অপরাধ রটনার কাজে যারা মাথা ঘামিয়েছিলাে, এ অপরাধের জন্যে তারা সবাই কিছু না কিছু দায়ী, অতপর এ ভােগান্তি বা শাস্তিও সবাইকে পেতে হবে।
তাই এরশাদ হচ্ছে, 'ওদের প্রত্যেকের জন্যে রয়েছে শান্তি যা সে অপরাধের বিনিময়ে অর্জন করেছে।' অর্থাৎ, যদি কেউ দুনিয়াতে শাস্তি না পায়, তাহলে অবশ্যই আল্লাহর কাছে তাকে তার দোষ অনুযায়ী সমুচিত শাস্তি পেতে হবে এবং সে শাস্তি হবে আরাে যন্ত্রণাদায়ক আরাে কঠিন।
আর যারা জেনে বুঝে কাউকে কষ্ট দেয়ার বদ-নিয়তে ইচ্ছাকৃতভাবে এ মিথ্যা রটনার কাজে শরীক হয়েছে তারা অবশ্যই গুনাহে কবীরায় লিপ্ত এবং যেহেতু তা বান্দাহর হকের সাথে জড়িত এজন্যে তাদেরকে আল্লাহ তায়ালা মাফ করবেন না, দুনিয়াতে যেমন তাদের শাস্তি রয়েছে, তেমনি রয়েছে আখেরাতেও। তাই এরশাদ হচ্ছে, 'আর ওদের মধ্য থেকে যে (এ ব্যাপারে) সব থেকে বড় হিসসা নিয়েছে তার জন্যে রয়েছে বিরাট আযাব।'
অর্থাৎ, যে কঠিন অপরাধ দুনিয়াতে সে করেছে তার প্রতিদানে সেই রকমই কঠিন শাস্তি তাকে দেয়া হবে। এই জঘন্য অপরজনক কাজের মধ্যে যে ব্যক্তি সব থেকে বড় অংশ নিয়েছিলাে এবং এই অপরাধের শিকার মাসুম মানুষগুলাের ওপর যে সর্বাপেক্ষা নিষ্ঠুর হামলা চালানাের জন্যে প্রস্তুত। হয়ে গিয়েছিলাে সে ছিলাে মােনাফেক সর্দার আবদুল্লাহ ইবনে উবাই ইবনে সালূল।
সে-ই ষড়যন্ত্রের মূল ঝান্ডা বহন করেছিলাে, সে জানতাে ইসলামী জামায়াতকে ভাংগার জন্যে সব থেকে নাযুক বিষয় কোনটা। আল্লাহ রব্বুল আলামীন এদেরকে তার ক্ষমতা বলে সার্বক্ষণিকভাবে ঘিরে না রাখলে তার রসূল(স.)-কে কঠিন চক্রান্তের আঘাত থেকে না বাঁচালে, ইসলামী দলের পরিচালনা তিনি নিজে না করলে এবং তিনি নিজেই তার দ্বীনের হেফাযত না করতে থাকলে সে তাই তার ষড়যন্ত্রে প্রায় সাফল্যমন্ডিত হয়েই গিয়েছিলাে।
এক বর্ণনায় জানা যায়, যখন সাফওয়ান ইবনে মােয়াত্তাল উম্মুল মােমেনীন আয়শা(রা.)-এর হাওদাজ বাঁধা উটনীটি নিয়ে মূল কাফেলার কাছে পৌছে গেলেন, তখন আবদুল্লাহ ইবনে উবায় তার গােত্রের মধ্যে অবস্থান করছিলাে। সে হাওদাজওয়ালা উটনীকে দেখেই ধৃষ্টতার সাথে জিজ্ঞাসা করলাে (হাওদাজে) কে এটা? লােকেরা বললাে, আয়শা(রা.)। তখন সংগে সংগে সে দুমুখাে লােকটা বলে উঠলাে, আল্লাহর কসম, সে ব্যক্তি থেকে সে কিছুতেই রেহাই পায়নি, সে ব্যক্তিও এ মহিলাটি থেকে রেহাই পায়নি। সে আরাে বললাে, 'আরে শুনেছাে তােমরা, তােমাদের নবীর স্ত্রী এক ব্যক্তির সাথে সারা রাত কাটিয়েছে, অবশেষে সকাল হয়ে গেছে, এখন সে তাকে সাথে করে উটের রশি ধরে (ভালাে মানুষ সেজে) নিয়ে এসেছে। ছিঃ, সে জাহান্নামের কীট এ কি জঘন্য কথা উচ্চরণ করলাে।
আল্লাহর হুকুমে, নবী(স.)-এর স্ত্রীদেরকে মােমেনদের মা বলে যারা জানে ও মানে তাদের সম্পর্কে এভাবে চিন্তা তাে সে-ই করতে পারে যে মুসলমান বলে পরিচয় দিলেও প্রকৃত পক্ষে সে আল্লাহর হুকুমের ধার ধারে না। এই কথা দ্বারাতেই তাে সে তার কপটতা প্রমাণ করেছে এবং জানিয়েছে যে, সে তার সংগি-সাথী সংঘবদ্ধ কপট দলের সর্দার, সে একটি স্বাভাবিক ঘটনাকে বাঁকা করে চিত্রিত করে এমনভাবে মুসলমানদের মুখে তুলে দিলাে যে তারা এই মিথ্যা কথাটা নির্দ্বিধায় বলাবলি করতে থাকলো এবং পুরাে একটি মাস ব্যাপী এক মুখােরােচক বিষয় হিসাবে এর চর্চা হতে থাকলাে, অথচ এটা তাে মুসলমানদের জন্যে প্রথম শােনার সাথে সাথেই মিথ্যা বলে উড়িয়ে দেয়া দরকার ছিলো।
এই ঘটনার আকস্মিকতা ও এটা নিয়ে সে নিবেদিত প্রাণ মুসলিম সমাজের এমন ঘৃণ্য কথা কি ভাবে আলােচনা হতে থাকলো তা চিন্তা করলে আজও মানুষ বিস্ময়ে হতবাক হয়ে যায়। এই কঠিন কূ-ধারণার বিষকে একেবারে ইসলামী জনগােষ্ঠির শরীরের মধ্যেই প্রবেশ করিয়ে দেয়া হয়েছিলাে এবং সবচেয়ে পবিত্র ব্যক্তিবর্গকে এবং সবার থেকে দোষমুক্ত মানুষদেরকে বেদনাহত করা হয়েছিলো। এ চরম নিন্দনীয় আন্দোলন এমন সুকৌশলে চালানাে হয়েছিলাে যার ছােবল গােটা মুসলিম উম্মাসহ স্বয়ং আল্লাহর রাসূল কে গ্রাস করে ফেলেছিলাে, ইসলামের ভিত্তিকেই নাড়িয়ে দিয়েছিলাে আল্লাহর ভয় ও ইসলামের নৈতিকতার মানকে প্রকম্পিত করেছিলাে।
স্বয়ং রসূলুল্লাহ (স.)-এর জীবনে এ পর্যন্ত যতাে কঠিন অবস্থা এসেছে এবং যতাে মারাত্মক পেরেশানীর মােকাবেলা তাঁকে এতাে বছর ধরে করতে হয়েছে তার মধ্যে এটা সম্ভবত ছিলাে সব থেকে কঠিন, কারণ অসহনীয় এ দুঃখ বেদনায় জর্জরিত হয়ে চরম উদাস মনে তিনি আল্লাহ রব্বুল আলামীনের সাহায্য প্রার্থী হয়েছেন, কাতরভাবে তিনি আল্লাহর দরবারে ফরিয়াদ জানিয়েছেন, যেন আল্লাহ তায়ালা তার ইযযত রক্ষা করেন, যে কোনাে বড় থেকে বড় অপরাধকে ক্ষমা করার মতাে প্রশস্ততা আল্লাহ তায়ালা তার হৃদয়ের মধ্যে দান করেছেন এবং তার মাকে সুন্দরভাবে সবর এখতিয়ার করার তাওফিক দান করেছেন।
তিনি এমন কথা বলা থেকে আল্লাহ রব্বুল আলামীনের কাছে পানাহ চেয়েছেন, যাতে তার ধৈর্যের বাঁধ ভেংগে গেছে বলে বুঝা যায় এবং পরীক্ষার এ বােঝা তিনি বইতে পারছেন না বলে প্রকাশ পায়। আর সত্যিকারের বলতে কি যে নিষ্ঠুর দুঃখ-বেদনার মােকাবেলা তাকে করতে হচ্ছিলাে, সম্ভবত তাঁর জীবনে শারীরিক বা মানসিক কোনাে দিক দিয়েই এমন কঠিন অবস্থা আর আসেনি, আর ইসলামের ইতিহাসেও এই মিথ্যার মতাে কঠিন বিপদও আর কখনাে আসেনি।

কোন মন্তব্য নেই