সে আমাদের অন্তর্ভুক্ত নয়।

 


সে আমাদের অন্তর্ভুক্ত নয়।

ভূমিকা:

আদর্শিক ঐক্যই একটি জাতির শ্রেষ্ঠত্বের পরিচয়। সমাজ ও ব্যক্তিজীবনে প্রত্যেকের নিজস্ব চিন্তাধারা থাকতে পারে, কিন্তু একটি নির্দিষ্ট আদর্শের অনুসারী হতে হলে তার মৌলিক নীতিমালা মেনে চলা অপরিহার্য। যখন কেউ সেই নির্ধারিত নীতি ও মূল্যবোধের পথ ছেড়ে অন্য পথে হাঁটে, তখন স্বাভাবিকভাবেই তার সাথে আদর্শিক বিচ্ছেদ ঘটে। সম্মান রেখেই বলতে হয়—পথ যখন ভিন্ন হয়, তখন পরিচয়ও আলাদা হয়ে যায়।


ইসলামের সুমহান আদর্শে এই বিষয়টি অত্যন্ত স্পষ্টভাবে ফুটে উঠেছে। একজন মুসলিম যখন ইসলামের মৌলিক নৈতিকতা থেকে বিচ্যুত হয় কিংবা লিপ্ত হয় জঘন্য কোনো অপরাধে, তখন তা কেবল একটি সাধারণ ত্রুটি থাকে না; বরং তা তার ঈমানি পরিচয়ের জন্য এক বিরাট হুমকি হয়ে দাঁড়ায়। এ কারণেই নবীজি ﷺ বিভিন্ন হাদিসে এ ধরনের আচরণের বিরুদ্ধে অত্যন্ত কঠোর ও হৃদকম্পনকারী হুঁশিয়ারি প্রদান করেছেন।


তিনি নির্দিষ্ট কিছু গর্হিত কাজের প্রেক্ষিতে সরাসরি ঘোষণা করেছেন— “لَيْسَ مِنَّا” (লাইসা মিন্না) অথবা “لَيْسَ مِنِّي” (লাইসা মিন্নি)”। যার মর্মার্থ হলো: “সে আমাদের অন্তর্ভুক্ত নয়” অথবা “সে আমার সুন্নাহর অনুসারী নয়”। এই বাক্যটি কোনো মুমিনের জন্য সাধারণ কোনো ভর্ৎসনা নয়, বরং এটি আত্মশুদ্ধির এক চরম সতর্কবার্তা।

নিচে এমন শ্রেণীর মানুষের কথা তুলে ধরা হলো, যাদের ব্যাপারে নবীজি (সা.) এই কঠোর শব্দ ব্যবহার করেছেন:


সামাজিক ও নৈতিক আচরণ। 

১. বড়-ছোটর অধিকার আদায় না করা: নবীজি (সা.) বলেছেন, "যে আমাদের ছোটদের স্নেহ করে না এবং বড়দের সম্মান ও অধিকার চেনে না, সে আমাদের অন্তর্ভুক্ত নয়।" (সুনানে তিরমিজি, হাদিস: ১৯২১)

২. ধোঁকাবাজি ও প্রতারণা: রাসুল (সা.) এর সামনে দিয়ে এক ব্যক্তি খাদ্যশস্য নিয়ে যাচ্ছিল, তিনি তাতে হাত ঢুকিয়ে ভেজা পেলেন। তখন তিনি বললেন, "যে আমাদের সাথে প্রতারণা করবে, সে আমাদের দলভুক্ত নয়।" (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ১০২)

৩. অস্ত্র প্রদর্শন বা আতঙ্ক সৃষ্টি: "যে ব্যক্তি আমাদের (মুসলিমদের) বিরুদ্ধে অস্ত্র ধারণ করবে, সে আমাদের অন্তর্ভুক্ত নয়।" (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৬৮৭৪)

৪. সম্পদ লুটতরাজ করা: "যে ব্যক্তি প্রকাশ্যে অন্যের সম্পদ লুণ্ঠন করে, সে আমাদের দলভুক্ত নয়।" (সুনানে আবু দাউদ, হাদিস: ৪৩৪০)

৫. প্রতিবেশীকে কষ্ট দেওয়া: "সেই ব্যক্তি মুমিন নয় যার অনিষ্ট থেকে তার প্রতিবেশী নিরাপদ থাকে না।" (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৬০১৬)। নবীজি (সা.) আরও বলেছেন, সে আমার আদর্শের ওপর নেই যে নিজে পেট ভরে খায় অথচ তার প্রতিবেশী ক্ষুধার্ত। (বায়হাকি)

আকিদা ও বিশ্বাসগত বিচ্যুতি।

৬. অশুভ লক্ষণে বিশ্বাস: "যে ব্যক্তি কুলক্ষণ (অশুভ লক্ষণ) মানে অথবা যার জন্য কুলক্ষণ দেখা হয়... সে আমাদের দলভুক্ত নয়।" (আল-মু'জামুল কাবির, তাবারানি: ১৮/১৬২)

৭. যাদু-টোনা করা বা করানো: যারা যাদু করে অথবা যাদুকরের কাছে গিয়ে সাহায্য চায়, তাদের ব্যাপারে নবীজি (সা.) এই কঠোর শব্দ ব্যবহার করেছেন। (তাবারানি)

৮. উগ্র জাতীয়তাবাদ বা গোত্রবাদ: "যে ব্যক্তি আসাবিয়াত (উগ্র গোত্রবাদ বা অন্ধ স্বাজাত্যবোধ)-এর দিকে ডাকল, সে আমাদের অন্তর্ভুক্ত নয়।" (সুনানে আবু দাউদ, হাদিস: ৫১২১)

৯. বিজাতীয় সংস্কৃতির অন্ধ অনুসরণ: "যে ব্যক্তি আমাদের ছাড়া অন্য জাতির সাথে সাদৃশ্য রাখে, সে আমাদের দলভুক্ত নয়।" (সুনানে তিরমিজি, হাদিস: ২৬৯৫)

১০. জাহেলি যুগের মতো শোক প্রকাশ: "যে শোকে নিজের গালে চড় মারে, কাপড় ছিঁড়ে ফেলে এবং জাহেলি যুগের মতো চিৎকার করে বিলাপ করে, সে আমাদের অন্তর্ভুক্ত নয়।" (সহিহ বুখারি, হাদিস: ১২৯৪)

পারিবারিক ও চারিত্রিক বিষয়

১১. পারিবারিক বিচ্ছেদ ঘটানো: "যে ব্যক্তি কোনো স্ত্রীকে তার স্বামীর বিরুদ্ধে প্ররোচিত করে, সে আমাদের অন্তর্ভুক্ত নয়।" (সুনানে আবু দাউদ, হাদিস: ২১৭৫)

১২. পিতা-মাতার অবাধ্যতা: পিতা-মাতার অবাধ্য সন্তানকে নবীজি (সা.) তাঁর আদর্শের বাইরের কাজ হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। (মুসনাদে আহমাদ)

১৩. জিনা বা ব্যভিচারে লিপ্ত হওয়া: ব্যভিচারকারীর থেকে ঈমান বের হয়ে যায় যতক্ষণ সে লিপ্ত থাকে। এটি নবীজির আদর্শের চরম পরিপন্থী। (সহিহ বুখারি)

১৪. হায়া বা লজ্জা বিসর্জন দেওয়া: "লজ্জা ঈমানের অংশ।" যারা নির্লজ্জতা প্রচার করে, তারা ঈমানের দাবি থেকে বিচ্যুত। (সহিহ মুসলিম)

১৫. সুন্নাহ (বিয়ে) থেকে মুখ ফিরিয়ে নেওয়া: "বিয়ে আমার সুন্নাত, যে আমার সুন্নাত থেকে মুখ ফিরিয়ে নেবে সে আমার (আদর্শের) অন্তর্ভুক্ত নয়।" (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৫০৬৩)

হক ও লেনদেনের সতর্কতা

১৬. আমানতের খেয়ানত করা: "যার মধ্যে আমানতদারি নেই তার মধ্যে ঈমান নেই।" আমানত নষ্ট করা আদর্শিক বিচ্যুতির বড় প্রমাণ। (মুসনাদে আহমাদ)

১৭. মিথ্যা শপথ ও সাক্ষ্য: "যে ব্যক্তি মিথ্যা কসম খেয়ে কোনো মুসলিমের সম্পদ আত্মসাৎ করে, আল্লাহ তার ওপর জান্নাত হারাম করে দেন।" (সহিহ মুসলিম)

১৮. সুদের কারবার করা: সুদখোর ও সুদের সাথে সংশ্লিষ্টদের ওপর লানত করা হয়েছে এবং তাদের নববী আদর্শের বাইরের লোক ধরা হয়। (সহিহ মুসলিম)

১৯. বংশ মর্যাদা নিয়ে তুচ্ছতাচ্ছিল্য: মানুষের বংশ তুলে গালি দেওয়াকে নবীজি (সা.) কুফরির একটি অংশ এবং জাহেলি স্বভাব হিসেবে বর্ণনা করেছেন। (সহিহ মুসলিম)

২০. পরনিন্দা বা চোগলখোরি: "চোগলখোর জান্নাতে প্রবেশ করবে না।" অর্থাৎ সে ইসলামের মূল ভ্রাতৃত্বের আদর্শ থেকে বিচ্যুত। (সহিহ বুখারি)


উপসংহার: পরকালে নবীজি ﷺ-এর শাফায়াত এবং হাউজে কাউসারের পানি পানের সৌভাগ্য পেতে হলে আমাদের এই ২০টি আচরণ থেকে কঠোরভাবে দূরে থাকতে হবে। আল্লাহ আমাদের প্রকৃত সুন্নাহর অনুসারী হওয়ার তৌফিক দান করুন। আমীন।


কোন মন্তব্য নেই

luoman থেকে নেওয়া থিমের ছবিগুলি. Blogger দ্বারা পরিচালিত.