বিসমিল্লাহ সম্পর্কে পূর্ণাঙ্গ ১০টি আলোচনা

 

بِسْمِ اللَّهِ الرَّحْمَٰنِ الرَّحِيمِ

একটি গুরুত্বপূর্ণ ইসলামী আলোচনা


বিসমিল্লাহ সম্পর্কে পূর্ণাঙ্গ ১০টি আলোচনা

ভূমিকা

আমরা প্রতিদিন অসংখ্য কাজ করি।ঘুম থেকে ওঠা, খাবার খাওয়া, ঘর থেকে বের হওয়া, পড়াশোনা করা, কাজ শুরু করা, কুরআন তেলাওয়াত করা, এমনকি ছোট ছোট অনেক কাজও আমাদের জীবনের অংশ।কিন্তু একজন মুমিনের জীবনে একটি ছোট্ট বাক্য এসব কাজকে আল্লাহর স্মরণের সঙ্গে যুক্ত করতে পারে।


সেই বাক্যটি হলো:

بِسْمِ اللَّهِ الرَّحْمَٰنِ الرَّحِيمِ

বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহীম।


অর্থ:-  “পরম করুণাময়, অসীম দয়ালু আল্লাহর নামে।”


বিসমিল্লাহ শুধু একটি বাক্য নয়। এটি একজন মুমিনকে মনে করিয়ে দেয় যে, তার শক্তি, সামর্থ্য ও সফলতার প্রকৃত উৎস আল্লাহ তাআলা।

আজকের আলোচনায় আমরা বিসমিল্লাহ সম্পর্কে দশটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় জানব।


১. বিসমিল্লাহর অর্থ ও ব্যাখ্যা

“বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহীম” তিনটি প্রধান অংশ নিয়ে গঠিত।         بِسْمِ اللَّهِ (বিসমিল্লাহ)  অর্থ: আল্লাহর নামে।


অর্থাৎ, আমি যে কাজটি শুরু করছি, তা আল্লাহর নাম স্মরণ করে এবং তাঁর সাহায্যের ওপর নির্ভর করে শুরু করছি।

الرَّحْمَٰنِ

আর-রাহমান অর্থ: পরম করুণাময়।

الرَّحِيمِ

আর-রাহীম অর্থ: অতি দয়ালু, অসীম দয়ালু।


আল্লাহর এই দুই নাম তাঁর রহমত ও দয়ার ব্যাপকতা প্রকাশ করে।

তাই যখন একজন মুমিন বলে, بِسْمِ اللَّهِ الرَّحْمَٰنِ الرَّحِيمِ


তখন সে যেন নিজের কাজের শুরুতেই স্বীকার করে:

“আমি একা নই। আমি আমার রবের নামে এবং তাঁর ওপর ভরসা করে শুরু করছি।”



২. বিসমিল্লাহ নতুন কোনো বিষয় নয়


বিসমিল্লাহর ধারণা শুধু আমাদের উম্মতের জন্য নতুন নয়।

কুরআনে পূর্ববর্তী নবীদের ঘটনাতেও আল্লাহর নাম স্মরণ করার বিষয়টি পাওয়া যায়।

হযরত নূহ (আ.) যখন তাঁর কিশতিতে আরোহণ করেছিলেন, তখন তিনি বলেছিলেন: بِسْمِ اللَّهِ مَجْرَاهَا وَمُرْسَاهَا


অর্থ: “আল্লাহর নামেই এর চলা এবং এর থামা।”


এটি সূরা হূদের ৪১ নম্বর আয়াতে উল্লেখ রয়েছে।

আবার হযরত সুলাইমান (আ.) যখন রানি বিলকিসের কাছে চিঠি পাঠিয়েছিলেন, সেই চিঠির শুরুতেও ছিল: بِسْمِ اللَّهِ الرَّحْمَٰنِ الرَّحِيمِ


অর্থাৎ: “পরম করুণাময়, অসীম দয়ালু আল্লাহর নামে।”


এটি সূরা আন-নামল, আয়াত ৩০-এ স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে।

এ থেকে আমরা বুঝতে পারি, আল্লাহর নাম নিয়ে কাজ শুরু করার শিক্ষা ইসলামী ঐতিহ্যের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অংশ।


৩. প্রত্যেক ভালো কাজে বিসমিল্লাহ বলার শিক্ষা


একজন মানুষ যখন কোনো কাজের শুরুতে আল্লাহর নাম নেয়, তখন সে নিজের অন্তরকে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় স্মরণ করিয়ে দেয়:

“এই কাজটি আল্লাহর সামনে।”


এটি মানুষের নিয়তকে সচেতন করতে সাহায্য করে।

যেমন একজন ব্যক্তি খাবার খাওয়ার আগে বিসমিল্লাহ বলল।

সে শুধু খাবার খাচ্ছে না। সে মনে করছে:“এই খাবার আল্লাহ আমাকে দিয়েছেন।”

একজন ছাত্র পড়াশোনার আগে আল্লাহর নাম নিল।

সে মনে করল:“জ্ঞান অর্জনের সামর্থ্যও আল্লাহর দান।”

একজন কর্মী কাজ শুরু করার আগে আল্লাহকে স্মরণ করল।

সে মনে করল:“আমার রিজিকের প্রকৃত মালিক আল্লাহ।”

এইভাবে বিসমিল্লাহ মানুষের দৈনন্দিন জীবনকে আল্লাহর স্মরণের সঙ্গে যুক্ত করে।


৪. বিসমিল্লাহর উপকারিতা


বিসমিল্লাহ বলার সবচেয়ে বড় উপকার হলো, এটি মানুষকে আল্লাহর কথা স্মরণ করিয়ে দেয়।

বিশেষ করে খাবারের ক্ষেত্রে রাসুলুল্লাহ ﷺ আল্লাহর নাম নেওয়ার শিক্ষা দিয়েছেন।

হযরত উমর ইবন আবু সালামাহ (রা.)-কে রাসুলুল্লাহ ﷺ খাবারের সময় বলেছেন:

“আল্লাহর নাম উল্লেখ করো, ডান হাতে খাও এবং তোমার সামনে থেকে খাও।”

এই হাদিসটি সহিহ বুখারি ও সহিহ মুসলিমে বর্ণিত হয়েছে।

অর্থাৎ খাবারের মতো সাধারণ একটি কাজও আল্লাহর স্মরণের মাধ্যমে সুন্নাহ অনুযায়ী করা যায়।


৫. বিসমিল্লাহর ফযীলত


বিসমিল্লাহর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ফযীলত হলো, এটি মুসলিমের দৈনন্দিন জীবনে আল্লাহর স্মরণকে জীবন্ত রাখে।

খাবারের সময় বিসমিল্লাহ বলা সম্পর্কে একাধিক সহিহ বা গ্রহণযোগ্য বর্ণনা রয়েছে।

রাসুলুল্লাহ ﷺ বলেছেন, কেউ খাবারের শুরুতে আল্লাহর নাম নিতে ভুলে গেলে মনে পড়ার পর বলতে পারে: بِسْمِ اللَّهِ فِي أَوَّلِهِ وَآخِرِهِ


অর্থ:“শুরুতেও এবং শেষেও আল্লাহর নামে।”


এই অর্থের হাদিস সুনান আবু দাউদ ও জামে তিরমিজিতে বর্ণিত হয়েছে।

তাই বিসমিল্লাহ শুধু মুখের একটি শব্দ নয়; এটি একজন মুসলিমের জীবনে আল্লাহকে স্মরণ করার একটি গুরুত্বপূর্ণ সুন্নাহ।





৬. বিসমিল্লাহর বরকত


বরকত মানে শুধু বেশি হওয়া নয়। বরং কোনো কাজে আল্লাহর পক্ষ থেকে কল্যাণ, উপকার ও স্থায়িত্ব পাওয়া।

একজন মানুষ অল্প খাবার পেলেও তাতে তৃপ্তি পেতে পারে। অল্প সময়ের মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ কাজ সম্পন্ন হতে পারে।অল্প সম্পদেও প্রয়োজন মিটে যেতে পারে।

এগুলোকে আমরা আল্লাহর বরকত হিসেবে আশা করি।

তবে কোনো নির্দিষ্ট পরিমাণ খাবার বা সম্পদ বিসমিল্লাহ বলার কারণে অবশ্যই বহুগুণ হয়ে যাবে, এমন দাবি করার ক্ষেত্রে সহিহ দলিল থাকা প্রয়োজন।


আমাদের মূল শিক্ষা হলো:

আল্লাহর নাম স্মরণ করে কাজ শুরু করা এবং তাঁর কাছ থেকে বরকত কামনা করা।


৭. বিসমিল্লাহর বৈশিষ্ট্য


বিসমিল্লাহর একটি বিশেষ বৈশিষ্ট্য হলো, কুরআনের সূরাগুলোর শুরুতে এটি অত্যন্ত পরিচিত একটি বাক্য।

সূরা তওবা ছাড়া অধিকাংশ মুসহাফে অন্যান্য সূরার শুরুতে বিসমিল্লাহ লেখা রয়েছে।

আর সূরা আন-নামলের ৩০ নম্বর আয়াতে বিসমিল্লাহ কুরআনের আয়াতের অংশ হিসেবে স্পষ্টভাবে এসেছে।

এটি আমাদের জন্য আল্লাহর নাম স্মরণ করার একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা বহন করে।


৮. কুরআন তেলাওয়াত ও গুরুত্বপূর্ণ কাজের শুরুতে বিসমিল্লাহ


কুরআন তেলাওয়াতের শুরুতে বিসমিল্লাহ পড়ার ব্যাপারে আলেমদের মধ্যে বিস্তারিত আলোচনা রয়েছে।

সাধারণভাবে কোনো সূরার শুরু থেকে তেলাওয়াত করলে, সূরা তওবা ছাড়া অন্যান্য সূরার শুরুতে বিসমিল্লাহ পড়া মুস্তাহাব বা সুন্নত হিসেবে অধিকাংশ আলেম উল্লেখ করেছেন।

তবে নামাজে বিসমিল্লাহ জোরে বা আস্তে পড়া এবং এটি সূরা ফাতিহার আয়াত কি না, এসব বিষয়ে মাজহাবভেদে মতভেদ রয়েছে।

উদাহরণস্বরূপ, শাফেয়ি মাজহাবে বিসমিল্লাহকে সূরা ফাতিহার একটি আয়াত হিসেবে গণ্য করা হয়, আর হানাফি ও অন্যান্য মাজহাবের মধ্যে এ বিষয়ে ভিন্ন মত রয়েছে।

তাই এ বিষয়ে কাউকে ভুল বলা উচিত নয়। এটি স্বীকৃত ফিকহি মতভেদের বিষয়।


৯. বিসমিল্লাহ কি স্বতন্ত্র আয়াত?


এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।বিসমিল্লাহ কুরআনের কোথায় এবং কীভাবে আয়াত হিসেবে গণ্য হবে, এ বিষয়ে প্রাচীনকাল থেকেই আলেমদের মধ্যে মতভেদ রয়েছে।তবে একটি বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই: সূরা আন-নামলের ৩০ নম্বর আয়াতে بِسْمِ اللَّهِ الرَّحْمَٰنِ الرَّحِيمِ


কুরআনের আয়াতের অংশ হিসেবে স্পষ্টভাবে এসেছে।

অন্য সূরাগুলোর শুরুতে থাকা বিসমিল্লাহকে পৃথক আয়াত হিসেবে গণ্য করা হবে কি না, বিশেষ করে সূরা ফাতিহার ক্ষেত্রে, এ বিষয়ে বিভিন্ন মাজহাবের আলাদা মত রয়েছে।

সুতরাং এ বিষয়ে সবচেয়ে সুন্দর পদ্ধতি হলো:

মতভেদকে সম্মান করা এবং দলিলভিত্তিকভাবে বিষয়টি বোঝা।


১০. বিসমিল্লাহ সম্পর্কিত গুরুত্বপূর্ণ মাসআলা


এখন আমরা কয়েকটি দৈনন্দিন মাসআলা সংক্ষেপে দেখি।

খাবার খাওয়ার সময় খাবার শুরু করার সময় বলা উচিত: بِسْمِ اللَّهِ


খাবারের শুরুতে বলতে ভুলে গেলে মনে পড়ার সময় বলা যায়:

بِسْمِ اللَّهِ فِي أَوَّلِهِ وَآخِرِهِ

এটি হাদিসে এসেছে। পশু জবাই


পশু জবাইয়ের ক্ষেত্রে আল্লাহর নাম নেওয়া অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং এ বিষয়ে ফিকহে বিস্তারিত বিধান রয়েছে।

এখানে ইচ্ছাকৃতভাবে বা ভুলবশত বিসমিল্লাহ না বলার বিধান নিয়ে মাজহাবভেদে বিস্তারিত আলোচনা আছে। তাই এটিকে এক লাইনে সাধারণীকরণ না করে আলেমদের ফিকহি ব্যাখ্যা অনুসরণ করা উচিত।



কুরআন তেলাওয়াত

সূরার শুরু থেকে তেলাওয়াত করলে, সূরা তওবা ছাড়া অন্যান্য সূরার শুরুতে বিসমিল্লাহ পড়া অধিকাংশ আলেমের মতে মুস্তাহাব।


বিসমিল্লাহ আমাদের জীবনে কী শিক্ষা দেয়?

এখন প্রশ্ন হলো:

আমরা কেন এত বেশি বিসমিল্লাহ বলব?

কারণ একজন মুমিনের জীবনে বিসমিল্লাহ একটি মানসিক পরিবর্তন তৈরি করতে পারে।

কাজ শুরু করার আগে সে থামে।

আল্লাহকে স্মরণ করে।

নিজের শক্তির ওপর অহংকার না করে আল্লাহর ওপর নির্ভর করে।

এবং মনে রাখে:

“আমি আল্লাহর বান্দা, আর আমার সবকিছুই আল্লাহর দান।”


একটি ছোট্ট বাস্তব উদাহরণ ধরুন, একজন শিশু খাবার খেতে বসেছে।

মা তাকে বললেন: “বাবা, বিসমিল্লাহ বলো।”

শিশুটি বলল: بِسْمِ اللَّهِ


হয়তো শব্দটি খুব ছোট। কিন্তু এই ছোট্ট শব্দের মাধ্যমে শিশুটি একটি বড় শিক্ষা পাচ্ছে: খাবার আল্লাহ দিয়েছেন।

তারপর সে বড় হলো।পড়াশোনা শুরু করার সময় আল্লাহকে স্মরণ করল।

কাজ শুরু করার সময় আল্লাহকে স্মরণ করল।ঘর থেকে বের হওয়ার সময় আল্লাহকে স্মরণ করল।তার জীবনের ছোট ছোট কাজগুলোও ধীরে ধীরে আল্লাহর স্মরণের সঙ্গে যুক্ত হতে থাকল।এটাই বিসমিল্লাহর অন্যতম সুন্দর শিক্ষা।


শেষ কথা

প্রিয় ভাই ও বোনেরা,

بِسْمِ اللَّهِ الرَّحْمَٰنِ الرَّحِيمِ


এই ছোট্ট বাক্যটি আমাদের জীবনে অনেক বড় একটি শিক্ষা বহন করে।

আমরা যেন শুধু মুখে বিসমিল্লাহ না বলি। বরং বিসমিল্লাহ বলার সময় এর অর্থও মনে রাখি:“আমি আল্লাহর নামে শুরু করছি।”

আল্লাহ আমাদের জীবনের প্রতিটি ভালো কাজ তাঁর নাম স্মরণ করে শুরু করার তাওফিক দান করুন।

আমাদের নিয়তকে পরিশুদ্ধ করুন।আমাদের কাজগুলোতে কল্যাণ ও বরকত দান করুন।এবং আমাদের জীবনকে তাঁর স্মরণে পরিপূর্ণ করে দিন।

آمين يا رب العالمين


সমাপ্তি


بِسْمِ اللَّهِ الرَّحْمَٰنِ الرَّحِيمِ

একটি ছোট্ট বাক্য

একটি বড় শিক্ষা

একটি মুমিনের জীবনের সুন্দর অভ্যাস


Created & Prepared by

JOHERUL ISLAM SUJON

কোন মন্তব্য নেই

luoman থেকে নেওয়া থিমের ছবিগুলি. Blogger দ্বারা পরিচালিত.